সর্বশেষ সংবাদ
সংবাদ লোড করা হচ্ছে...
আপনি জিয়াউর রহমান বিষয়ক এই লেখাটি পড়ছেন

মেজর জিয়াউর রহমান: এক সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক – বাংলাদেশের ইতিহাসের বাঁক বদলের কারিগর

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ০১, ২০২৫

 

শহীদ জিয়াউর রহমান 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এক অত্যন্ত আলোচিত এবং বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের শুরু হলেও, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তাঁর ভূমিকা তাকে নিয়ে আসে ক্ষমতার কেন্দ্রে। সামরিক শাসক থেকে রাষ্ট্রপতি—জিয়াউর রহমানের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তার উত্থান, শাসনকাল এবং পতন—সবকিছুই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


প্রাথমিক জীবন ও সামরিক কর্মজীবন

জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মনসুর রহমান একজন রসায়নবিদ হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কাজ করতেন। কলকাতা ও করাচিতে তার শিক্ষাজীবন কাটে। ১৯৫৩ সালে তিনি কাকুলস্থ পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে কমিশন লাভ করেন এবং একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি কুশলী নেতৃত্ব দেন এবং অসামান্য বীরত্বের জন্য সিতারা-ই-জুরাত খেতাবে ভূষিত হন। এই সময়েই তিনি সামরিক মহলে একজন দক্ষ ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।


স্বাধীনতা যুদ্ধে ভূমিকা

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ২৬শে মার্চ তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যা ছিল বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তার এই ঘোষণা যুদ্ধকালীন সময়ে জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের অস্তিত্ব জানান দিয়েছিল।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে জেড ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। রণাঙ্গনে তার সাহসিকতা ও রণকৌশল তাকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে তার গুরুত্বপূর্ণ পদ ছিল।


স্বাধীনতা-পরবর্তী সামরিক ও রাজনৈতিক উত্থান (১৯৭২-৭৫)

স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চরম অস্থিরতা দেখা দেয়। একই বছর ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয় জেলহত্যা। এরপর ৬ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়।

তবে, ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে সংঘটিত "সিপাহী-জনতার বিপ্লব" জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তাকে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত করা হয় এবং তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে "সিপাহী বিপ্লব" নামে পরিচিত এবং এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।


সামরিক শাসন ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা গ্রহণ (১৯৭৫-১৯৮১)

৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। তার ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়াটি ছিল সামরিক শাসনের অধীনে।


ক্ষমতা সুসংহতকরণ: ক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান তার অবস্থান সুসংহত করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেন। তিনি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা দমনে কঠোর হাতে পদক্ষেপ নেন এবং বেশ কয়েকটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান দমন করেন।


রাজনৈতিক দল গঠনের অনুমতি: একদলীয় বাকশাল শাসনের পর জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে আবার সক্রিয় হওয়ার অনুমতি দেন।


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। এই দলের মাধ্যমে তিনি তার রাজনৈতিক ক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। বিএনপি দ্রুতই দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।


জিয়াউর রহমানের শাসনকাল: নীতি ও সংস্কার (১৯৭৫-১৯৮১)

জিয়াউর রহমানের শাসনকালকে বেশ কিছু নীতি ও সংস্কারমূলক কাজের জন্য স্মরণ করা হয়:


অর্থনৈতিক সংস্কার: তিনি দেশের অর্থনীতিকে সচল করার জন্য উদারীকরণ নীতি গ্রহণ করেন। শিল্প-কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় ফিরিয়ে আনা হয় এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়। "খাল কাটা কর্মসূচি" এবং কৃষি উন্নয়নে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার উপর জোর দেন।


বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা: একদলীয় শাসন থেকে বেরিয়ে এসে বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা শুরু করা তার একটি বড় পদক্ষেপ ছিল। যদিও এই প্রক্রিয়া সামরিক শাসনের অধীনে শুরু হয়েছিল, তবে এটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করে।


কূটনীতি ও পররাষ্ট্র নীতি: জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য সার্ক (SAARC) গঠনের উদ্যোগ নেন।


জাতীয়তাবাদের নতুন সংজ্ঞা: তিনি "বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ" এর ধারণা প্রবর্তন করেন, যা ভাষাগত জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে গুরুত্ব দেয়। এটি সমাজের বিভিন্ন স্তরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।


শিক্ষার প্রসার: শিক্ষার প্রসারেও তার সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।


বিতর্ক ও সমালোচনা

জিয়াউর রহমানের শাসনামল বিভিন্ন কারণে সমালোচিতও হয়:


সামরিক আইন ও গণতন্ত্র: সামরিক শাসনের অধীনে ক্ষমতারোহণ এবং গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকরা বলেন, তিনি গণতন্ত্রের আড়ালে সামরিক শাসন চালিয়েছেন।


মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি: তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ ওঠে, বিশেষ করে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং যুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে।


ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করতে জারি করা 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ'কে পরবর্তীতে বৈধতা দেওয়ার জন্য তার সরকারকে সমালোচিত হতে হয়।


যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন: যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত কিছু ব্যক্তিকে তার সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী বলে বিবেচিত হয়।


রাজনৈতিক দমন: তার শাসনামলে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ও বাইরে বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক কর্মকর্তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়, যা নিয়ে বিতর্ক এখনো চলমান।


শাহাদাত বরণ

১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তার আকস্মিক মৃত্যু দেশের রাজনীতিতে এক বড় শূন্যতা তৈরি করে এবং পরবর্তীকালে দীর্ঘ সামরিক শাসন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়।


উপসংহার

মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক জটিল ও প্রভাবশালী চরিত্র। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার অবদান, সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতারোহন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক হিসেবে তার দাবি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রচেষ্টা—সবকিছুই বাংলাদেশের ইতিহাসকে নতুন রূপ দিয়েছে। তার শাসনকাল যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভিজ্ঞতা দিয়েছে, তেমনি সামরিক হস্তক্ষেপ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগেও জর্জরিত। জিয়াউর রহমান আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে আছেন এবং তার কর্মজীবন ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা সম্ভবত আরও দীর্ঘকাল ধরে চলবে। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক বাঁক বদলের কারিগর, যার Legacy নিয়ে জনমত আজও গভীরভাবে বিভক্ত।




Comments

Post a Comment