মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে শুক্রবার অত্যন্ত পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। শুক্রবারকে ইসলামে "সপ্তাহের রাজা" বলা হয়। এই দিনটি কেবলমাত্র একটি সাধারণ দিন নয়, বরং এটি ইসলামিক ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা এবং সামাজিক সংহতির এক অনন্য প্রতীক। আসুন জানি মুসলমানদের জীবনে শুক্রবারের আসল কারণ এবং এর গভীর অর্থ।
শুক্রবারের ইসলামিক গুরুত্ব
ইসলামে শুক্রবার বা জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে যা কোন অন্য দিনের তুলনায় অতুলনীয়। পবিত্র কোরআনে শুক্রবারের কথা উল্লেখ করে সূরা জুমার নাম দেওয়া হয়েছে, যা এই দিনের গুরুত্ব প্রমাণ করে। আল্লাহ বলেছেন, "যখন জুমার নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা সেই দিকে দ্রুত এগিয়ে যাও।"
নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, শুক্রবার হল সপ্তাহের সেরা দিন। এই দিনে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন হযরত আদম (আলাইহি ওয়াস্সালাম) কে, এই দিনেই তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেছিলেন এবং এই দিনেই কিয়ামত হবে। এমনকি শুক্রবারে একটি বিশেষ সময় রয়েছে যখন আল্লাহর কাছে কোন প্রার্থনা অস্বীকার করা হয় না।
জুমার নামাজের ফজিলত
শুক্রবারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল জুমার নামাজ, যা প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষের জন্য ফরজ। জুমার নামাজ সাধারণত দুপুরের সময় জামাতের সাথে মসজিদে আদায় করতে হয়। এই নামাজের আগে খুতবা বা ওয়াজ দেওয়া হয় যেখানে ধর্মীয় উপদেশ এবং সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হয়।
জুমার নামাজের ফজিলত অসংখ্য। হাদিসে বর্ণিত আছে যে জুমার নামাজে উপস্থিত প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তির গুনাহ মাফ হয় এবং আগামী সপ্তাহের রিজিক বৃদ্ধি পায়। মসজিদে জুমার নামাজের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এবং সময়মতো উপস্থিত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
শুক্রবারে ইবাদত এবং আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনা
শুক্রবার হল আধ্যাত্মিক উন্নতির এক বিশেষ সময়। এই দিনে অনেক মুসলিম অতিরিক্ত নফল নামাজ পড়েন, কোরআন তিলাওয়াত করেন এবং দোয়া করেন। শুক্রবারের রাতকে "রাত্রি আল-কাদির" এর মত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
শুক্রবারের দিন এবং রাতে বেশি বেশি দোয়া করা হয়। বিশেষত জুমার নামাজের পরে একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে যখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা অবশ্যই কবুল হয়। এই সময়কে "ঘড়ি মুজাব" বলা হয়। পরিবার, বন্ধু এবং প্রিয়জনদের জন্য এই সময়ে দোয়া করা অত্যন্ত কার্যকর বলে বিশ্বাস করা হয়।
শুক্রবারের ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং ইসলামিক ইতিহাস
শুক্রবার শুধু একটি সাধারণ দিন নয়, বরং ইসলামের ইতিহাসে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই দিনে সংঘটিত হয়েছে। এই ঘটনাগুলি মুসলিম জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেছে এবং ইসলামের ইতিহাসে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
হযরত আদম (আলাইহি ওয়াস্সালাম) এর সৃষ্টি
ইসলামিক শিক্ষায় বলা হয় যে আল্লাহ তাআলা শুক্রবারে হযরত আদম (আলাইহি ওয়াস্সালাম) কে সৃষ্টি করেছিলেন, যিনি মানব জাতির আদি পিতা। এই সৃষ্টিই মানব সভ্যতার সূচনা করেছিল। হাদিসে বর্ণিত আছে যে শুক্রবার হল সেই দিন যখন আল্লাহ সর্বপ্রথম মানুষ সৃষ্টি করেন এবং সর্বশেষে মানুষ সৃষ্টি করবেন। এই কারণেই শুক্রবারকে মানবতার জন্ম দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জন্ম এবং মৃত্যু
নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জন্ম এবং মৃত্য় উভয়ই শুক্রবারে হয়েছিল বলে অনেক ইসলামিক স্কলার বিশ্বাস করেন। তিনি ১২ রবিউল আউয়াল, শুক্রবার দিনে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তার জন্ম ইসলাম এবং মানবতার জন্য আলোর সূচনা করেছিল। একইভাবে, তিনি ১২ রবিউল আউয়াল, শুক্রবার দিনে মদিনায় ইন্তিকাল করেছিলেন।
বদর যুদ্ধ - ইসলামের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিজয়
বদর যুদ্ধ ছিল ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলির মধ্যে একটি। এটি ঘটেছিল ২ হিজরির ১৭ রমজান, যা একটি শুক্রবার ছিল। এই যুদ্ধে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তার ৩১৩ জন সাহাবা মক্কার কুরাইশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিলেন। এটি মুসলিমদের প্রথম বড় সামরিক বিজয় এবং ইসলামের শক্তি প্রদর্শন করেছিল।
বদর যুদ্ধ শুক্রবারে সংঘটিত হওয়া এটি প্রমাণ করে যে শুক্রবার মুসলিমদের জন্য একটি বিশেষ আশীর্বাদের দিন। এই যুদ্ধে মুসলিমরা মিরাকেল অনুভব করেছিলেন এবং আল্লাহর সাহায্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
উহুদ যুদ্ধ
উহুদ যুদ্ধ ছিল বদরের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ, যা ৩ হিজরির শাওয়াল মাসে শুক্রবার দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে মুসলিমরা প্রাথমিক সুবিধা পেয়েছিলেন কিন্তু পরে কুরাইশরা প্রতিঘার সুযোগ পায়। এটি একটি কঠিন পরীক্ষা ছিল যা মুসলিমদের ধৈর্য এবং দৃঢ় সংকল্প পরীক্ষা করেছিল।
খন্দক যুদ্ধ (আহজাব যুদ্ধ)
খন্দক যুদ্ধ ছিল ৫ হিজরায় শুক্রবার দিনে সংঘটিত একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। এতে মদিনার ইহুদি এবং মুশরিক জোট নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বিরুদ্ধে আক্রমণ করেছিল। মুসলিমরা একটি কৌশলগত খন্দক (পরিখা) খুঁড়ে মদিনা রক্ষা করেছিলেন এবং আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য লাভ করে বিজয়ী হয়েছিলেন।
ফতহে মক্কা - ইসলামের সবচেয়ে বড় বিজয়
ফতহে মক্কা, যা ৮ হিজরার ২০ রমজান শুক্রবার দিনে ঘটেছিল, ইসলামের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয়। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুক্রবার দিনে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন এবং কাবা শরীফ পরিষ্কার করে সেখানে মূর্তি ভাঙ্গান হয়েছিল। এর পর থেকে মক্কা ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত হয়েছে।
ফতহে মক্কার মাধ্যমে ইসলাম আরবের পুরো অঞ্চল জয় করে এবং মুসলিম উম্মাহ একটি শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হয়েছিল। শুক্রবার দিনে এই বিজয় ঘটা এটি প্রমাণ করে যে আল্লাহ তার প্রিয় দিনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন।
সামাজিক সংহতি এবং সম্প্রদায়ের বন্ধন
শুক্রবার মুসলিম সমাজের জন্য একটি সামাজিক সংযোগ স্থাপনের দিন। জুমার নামাজে সকল মসজিদে হাজার হাজার মুসলিম একত্রিত হন, যা সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি সৃষ্টি করে। এই সমাবেশ অমীয় সামাজিক বন্ধন তৈরি করে।
মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করার মাধ্যমে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়, যা সামাজিক সমতা এবং মানবিক মর্যাদার প্রতীক। শুক্রবারে পড়শি এবং বন্ধুদের সাথে দেখা হয়, খোঁজখবর নেওয়া হয় এবং সম্পর্কের বন্ধন আরও মজবুত হয়।
শুক্রবারের প্রস্তুতি এবং আচরণবিধি
শুক্রবারে জুমার নামাজের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। এর মধ্যে রয়েছে সকালে গোসল করা, পরিষ্কার পোশাক পরা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা। নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুক্রবারে গোসল করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত জোর দিয়ে গেছেন।
তাড়াতাড়ি মসজিদে যাওয়া, আযানের আগে পৌঁছানো এবং সামনের কাতারে জায়গা করা শুক্রবারের আদব। জুমার নামাজের সময় অপরের ডান-বাম দিকে ঝাঁকুনি দেওয়া বা কথা বলা নিষেধ। এই সময়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ এবং শ্রদ্ধার সাথে নামাজ আদায় করা উচিত।
শুক্রবারে সব কাজকর্ম থেমে যাওয়ার তাৎপর্য
অনেক ইসলামিক দেশে শুক্রবার আংশিক বা সম্পূর্ণ ছুটির দিন থাকে। এর কারণ হল জুমার নামাজ যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। বাণিজ্যিক কাজকর্ম থেমে যাওয়ার অর্থ হল আল্লাহর ইবাদতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। এটি আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও আধ্যাত্মিকতাকে স্থান দেওয়ার শিক্ষা দেয়।
নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "যে ব্যক্তি জুমার নামাজের জন্য গোসল করবে এবং যথাসময়ে উপস্থিত হবে, তার জন্য প্রতিটি পদক্ষেপে নেকি রয়েছে।" এই বার্তা প্রকাশ করে যে শুক্রবারে নামাজের প্রতি আগ্রহ এবং উৎসাহ দেখানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবার এবং ব্যক্তিগত জীবনে শুক্রবারের প্রভাব
শুক্রবার পরিবারের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। অনেক মুসলিম পরিবার শুক্রবারে পরিবারের সবাই একসাথে সময় কাটায়, খাবার পরিকল্পনা করে এবং সপ্তাহের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। শুক্রবারের দুপুরে পরিবারের সাথে খাবার খাওয়া একটি প্রথাগত অনুশীলন।
এছাড়াও, শুক্রবারে পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সাথে সময় ব্যয় করেন এবং সম্পর্ক আরও গভীর করেন। এটি বাড়ির পরিবেশে ভালোবাসা এবং যত্নের বার্তা প্রচার করে।
আধুনিক যুগে শুক্রবারের প্রাসঙ্গিকতা
আধুনিক ব্যস্ত জীবনযাত্রায় শুক্রবার একটি আধ্যাত্মিক বিরতির দিন হিসেবে কাজ করে। বিশ্বব্যাপী মুসলিম সম্প্রদায় যেখানেই থাকুক না কেন, শুক্রবারে জুমার নামাজ আদায় করে। এটি একটি বৈশ্বিক সংযোগ যা সকল মুসলিমকে এক সূত্রে বাঁধে।
প্রযুক্তির এই যুগেও শুক্রবারের গুরুত্ব অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যারা মসজিদে যেতে পারেন না তারাও ঘরে বসে অনলাইনের মাধ্যমে খুতবা শোনেন এবং নামাজ আদায় করেন। এটি প্রমাণ করে যে শুক্রবার শুধু একটি দিন নয়, এটি মুসলিম পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
উপসংহার
শুক্রবার বা জুমার দিন মুসলমানদের জীবনে একটি পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় দিন নয়, বরং এটি সামাজিক সংহতি, পারিবারিক বন্ধন এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির এক অপূর্ব সমন্বয়। ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি - মানুষের সৃষ্টি থেকে শুরু করে বদর, উহুদ এবং ফতহে মক্কার মতো বড় যুদ্ধ - শুক্রবারে ঘটেছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শুক্রবার শুধু একটি দিন নয়, এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের দিন। প্রতিটি মুসলমান শুক্রবারকে সম্মান করে এবং এই দিনের তাৎপর্য বুঝে জীবন পরিচালনা করে। শুক্রবারে জুমার নামাজ আদায় এবং ইবাদতে মনোনিবেশ করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য একটি অর্থবহ এবং অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে।
মানুষ হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো — আমরা কেন এসেছি? জীবনের উদ্দেশ্য কী? দার্শনিকরা যুগে যুগে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই স্পষ্ট — কোরআন ও হাদিসে তা সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে জীবনের উদ্দেশ্য শুধু ইবাদত বা নামাজ-রোজায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার অংশ।
আল্লাহর ইবাদতই মূল উদ্দেশ্য
একজন মুসলিমের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য সরাসরি কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন —
"আমি জিন ও মানুষকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।"
(সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)
এই একটি আয়াতই মানবজীবনের মূল উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে দেয়। তবে এখানে "ইবাদত" শব্দটিকে শুধু নামাজ বা রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, ইবাদতের অর্থ হলো জীবনের প্রতিটি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। পরিবারের ভরণপোষণ করাও ইবাদত, সত্য কথা বলাও ইবাদত, এমনকি হাসিমুখে কাউকে সালাম দেওয়াও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন — "প্রতিটি ভালো কাজই সদকা।" (সহিহ বুখারি: ২৯৮৯)
এর মানে হলো, একজন মুসলিমের প্রতিটি ইতিবাচক কর্মকাণ্ড — কাজে সততা, পরিবারের সাথে সদাচার, সমাজের উপকার করা — সবকিছুই ইবাদতের মধ্যে পড়ে।
খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা
ইসলামে মানুষকে শুধু ইবাদতকারী হিসেবে নয়, বরং পৃথিবীর "খলিফা" বা প্রতিনিধি হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
"আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি সৃষ্টি করব।"
(সূরা আল-বাকারা: ৩০)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, একজন মুসলিমের জীবনের উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তিগত মুক্তি নয় — বরং পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, পরিবেশ রক্ষা করা, মানুষের কল্যাণে কাজ করাও এই দায়িত্বের অন্তর্গত। একজন ভালো মুসলিম তাই শুধু মসজিদে নয়, অফিসে, বাজারে, পরিবারে — সর্বত্র আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আচরণ করেন।
আখিরাতের জন্য দুনিয়ায় প্রস্তুতি নেওয়া
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী — এটি আখিরাতের জন্য একটি পরীক্ষার মাঠ।
"প্রতিটি প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। আর তোমাদেরকে কিয়ামতের দিন পুরোপুরি প্রতিদান দেওয়া হবে।"
(সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)
এই সত্যটি উপলব্ধি করলে জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বদলে যায়। হারাম উপায়ে অর্থ উপার্জন, অন্যের অধিকার নষ্ট করা, মিথ্যা বলা — এসব কাজ যখন পরকালের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হয়, তখন স্বভাবতই একজন মুসলিম সেগুলো থেকে দূরে থাকতে চান।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন — "দুনিয়া হলো মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।" (সহিহ মুসলিম: ২৯৫৬)
এর অর্থ এই নয় যে মুসলিমরা দুনিয়াকে অবহেলা করবেন। বরং এর অর্থ হলো — দুনিয়ার ভোগবিলাসে ডুবে না গিয়ে সীমার মধ্যে জীবন পরিচালনা করাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
জ্ঞান অর্জন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য
ইসলামে জ্ঞান অর্জনকে প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরজ করা হয়েছে। কোরআনের প্রথম নাজিলকৃত শব্দই হলো "ইকরা" অর্থাৎ "পড়ো"। (সূরা আল-আলাক: ১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন — "জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ।" (ইবনে মাজাহ: ২২৪)
এর মানে হলো, একজন মুসলিম শুধু ধর্মীয় জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, সমাজবিজ্ঞান — প্রতিটি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা এবং সেই জ্ঞান মানবকল্যাণে ব্যবহার করাও ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
চরিত্র গঠন ও নৈতিক জীবনযাপন
রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে —
"আমাকে পাঠানো হয়েছে উত্তম চরিত্রকে পরিপূর্ণ করতে।"
(মুয়াত্তা মালিক: ১৬১৪)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে ইসলামের কেন্দ্রে রয়েছে চরিত্র গঠন। সততা, বিনয়, ধৈর্য, পরোপকার, ক্ষমাশীলতা — এই গুণগুলো অর্জন করাই একজন প্রকৃত মুসলিমের লক্ষ্য হওয়া উচিত। শুধু নামাজ পড়লেই কেউ ভালো মুসলিম হয় না, যদি তার চরিত্র দুর্বল থাকে।
আল্লাহ কোরআনে বলেন — "নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের অধিকারী।" (সূরা আল-কালাম: ৪)
পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব
একজন মুসলিমের জীবনের উদ্দেশ্য কখনোই শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। ইসলাম সমাজ ও পরিবারের প্রতি দায়িত্বকে ইবাদতের সমকক্ষ মনে করে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন — "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিযি: ৩৮৯৫)
এছাড়াও তিনি বলেছেন — "মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।" (সহিহ বুখারি: ১০)
এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক রাখা, দুর্বল ও গরীবদের সাহায্য করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা — এসব কাজও একজন মুসলিমের জীবনের অংশ।
তাওবা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা
মানুষ মাত্রই ভুল করে। ইসলাম কখনো বলেনি যে মুসলিমরা নিষ্পাপ হবে। বরং আল্লাহ বলেছেন —
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা বারবার তওবা করে এবং নিজেদের পবিত্র রাখে।"
(সূরা আল-বাকারা: ২২২)
প্রতিদিনের জীবনে আত্মসমীক্ষা করা, ভুল হলে তওবা করা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসা — এটাই একজন সচেতন মুসলিমের স্বভাব। জীবনের উদ্দেশ্য পূরণে বাধা আসবে, পাপ হবে, কিন্তু থেমে না গিয়ে বারবার ফিরে আসাটাই ইসলামের শিক্ষা।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে একজন মুসলিমের জীবনের উদ্দেশ্য বহুমাত্রিক। শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয় — আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সৎভাবে জীবন পরিচালনা করা, পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা, জ্ঞান অর্জন করা, উত্তম চরিত্র গড়ে তোলা, পরিবার ও সমাজের কল্যাণে কাজ করা এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া — এই সবগুলো মিলেই একটি পূর্ণাঙ্গ মুসলিম জীবন গঠিত হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন — "যে ব্যক্তি সৎকর্ম করে, পুরুষ হোক বা নারী, এবং সে মুমিন হয় — আমি তাকে অবশ্যই পবিত্র জীবন দান করব।" (সূরা আন-নাহল: ৯৭)
তাই আসুন, প্রতিটি দিনকে এই উদ্দেশ্যের আলোকে নতুন করে শুরু করি — কারণ জীবন ছোট, আর দায়িত্ব অনেক।
হালাল উপার্জন বলতে এমন আয়কে বোঝায় যা শরীয়তসম্মত পথে এবং সততার সাথে অর্জিত হয়। এটি কেবল চুরি বা ডাকাতি থেকে বিরত থাকা নয়, বরং ব্যবসায়িক ধোঁকাবাজি, সুদের কারবার, ঘুষ, মাপে কম দেওয়া এবং অন্যের হক নষ্ট করা থেকে বেঁচে থাকাকেও বোঝায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:
"হে মানবমন্ডলী, পৃথিবী থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।" (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৬৮)
ইসলামি শরীয়তে ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য প্রধান শর্ত হলো হালাল রিজিক। দেহ যদি হারাম খাদ্যে পুষ্ট হয়, তবে সেই দেহ নিয়ে করা ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। হাদিস শরীফে এসেছে:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গঠিত হয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (মিশকাতুল মাসাবীহ)
সালাত, সিয়াম বা হজ—সবই পণ্ড হতে পারে যদি আমাদের আয়ের উৎস স্বচ্ছ না হয়। দোয়া কবুল হওয়ার ক্ষেত্রেও হালাল লুকমা বা খাবারের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত সা'দ (রা.)-কে বলেছিলেন, "হে সা'দ! তোমার খাবার পবিত্র করো, তবেই তুমি মুজাবুদ দাওয়াত (যার দোয়া কবুল হয়) হতে পারবে।"
ইসলাম মানুষকে অলস হয়ে বসে থাকতে নিরুৎসাহিত করেছে। মহানবী (সা.) নিজের হাতে কাজ করাকে শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আল্লাহর নবীগণও পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। হযরত দাউদ (আ.) বর্ম তৈরি করতেন এবং হযরত যাকারিয়া (আ.) কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"নিজের হাতে উপার্জিত খাবারের চেয়ে উত্তম খাবার কেউ কখনো খায়নি।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯৬৩)
আরো পড়ুন- মসজিদুল আকসার গুরুত্ব কী? — ইতিহাস, কুরআন-হাদিস ও মুসলমানের দায়িত্ব একসাথে
আল্লাহ তাআলা জুমার সালাতের পরপরই রিজিক অন্বেষণে বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ইবাদত এবং উপার্জন একে অপরের পরিপূরক।
"অতঃপর সালাত শেষ হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।" (সূরা আল-জুমুআ, আয়াত: ১০)
হারাম উপার্জন সাময়িকভাবে সম্পদ বৃদ্ধি করলেও তাতে কোনো বরকত থাকে না। এটি ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজে বিপর্যয় ডেকে আনে।
যারা ব্যবসার সাথে জড়িত, ইসলাম তাদের জন্য অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা ঘোষণা করেছে—যদি তারা সৎ হয়। ইসলামে ওজনে কম দেওয়া (তাতফীফ) অত্যন্ত গর্হিত কাজ।
"ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়।" (সূরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত: ১)
বিপরীতে, একজন সৎ ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক এবং শহীদদের সাথে অবস্থান করবেন। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য বিশাল এক সুসংবাদ।
বর্তমান যুগে সুদ (Riba), ঘুষ এবং ডিজিটাল জালিয়াতির প্রসার হালাল উপার্জনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। অনলাইনে আয়ের ক্ষেত্রেও (যেমন: ফ্রিল্যান্সিং বা ডিজিটাল মার্কেটিং) আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন কাজের ধরণ এবং কনটেন্ট ইসলামি শরীয়ত বিরোধী না হয়। ধোঁকাবাজি বা মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করাও হারামের অন্তর্ভুক্ত।
১. মানসিক প্রশান্তি: হালাল উপার্জনকারী ব্যক্তি সবসময় এক ধরণের আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন, যা কোটি টাকা খরচ করেও পাওয়া সম্ভব নয়।
২. সন্তানের উত্তম চরিত্র: হালাল রিজিকের মাধ্যমে সন্তান প্রতিপালন করলে তাদের মধ্যে নেক আমল ও উন্নত নৈতিকতা গড়ে ওঠে।
৩. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: সমাজে সবাই যখন সততার সাথে লেনদেন করে, তখন মুদ্রাস্ফীতি ও দারিদ্র্য হ্রাস পায়।
পরিশেষে বলা যায়, হালাল উপার্জন কেবল ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একটি সুন্দর ও শান্তিময় সমাজ গঠনের ভিত্তি। অল্প সম্পদ যদি হালাল উপায়ে অর্জিত হয়, তাতে যে বরকত থাকে, তা পাহাড়সম হারাম সম্পদে থাকে না। তাই আমাদের উচিত প্রতিটি পয়সা উপার্জনের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার কথা স্মরণ রাখা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র ও হালাল রিজিক অন্বেষণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ফিলিস্তিনের পবিত্র নগরী জেরুজালেমে অবস্থিত এই মসজিদ নিয়ে অনেকেরই মনে প্রশ্ন আসে — কেন এই মসজিদ এত গুরুত্বপূর্ণ? কুরআন-হাদিসে এর কথা কীভাবে এসেছে? কারা এটি তৈরি করেছিলেন? আজকের এই আর্টিকেলে সেই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
মসজিদুল আকসা কোথায় এবং এর নামের অর্থ কী?
'আকসা' আরবি শব্দ, অর্থ 'দূরবর্তী'। মক্কা থেকে দূরে হওয়ার কারণে এই নামটি দেওয়া হয়েছে। মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস হলো জেরুসালেমের পুরনো শহরে অবস্থিত ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ। (Wikipedia)
এর সাথে একই প্রাঙ্গণে কুব্বাত আস-সাখরা, কুব্বাত আস-সিলসিলা ও কুব্বাত আন-নবী নামক স্থাপনাগুলো অবস্থিত। স্থাপনাগুলোসহ এই পুরো স্থানটিকে হারাম আল-শরিফ বলা হয়। (Wikipedia) অনেকে সোনালি গম্বুজওয়ালা কুব্বাত আস-সাখরাকেই আল-আকসা মনে করেন, এটি একটি ভুল ধারণা। কুব্বাত আস-সাখরা মূলত একটি পৃথক স্থাপনা।
পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম মসজিদ
মসজিদে আকসার একটি বড় পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য হল, এটি পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় প্রাচীন মসজিদ। মসজিদে হারামের পরেই এই মসজিদের বুনিয়াদ স্থাপিত হয়েছে। (Alkawsar)
আরো পড়ুন-তাওয়াক্কুল: আল্লাহর উপর ভরসা রাখলে যে অলৌকিক পরিবর্তন আসে — কুরআন ও হাদিসের আলোয়
আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বিখ্যাত হাদিসে এসেছে — তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মসজিদ নির্মিত হয়েছে? রাসূল (সা.) বললেন: মসজিদুল হারাম। আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন: মসজিদুল আকসা। আমি বললাম, এই দুটির মাঝে কত সময়ের ব্যবধান? তিনি বললেন: চল্লিশ বছর। (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, আল আকসা পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। মক্কায় মসজিদুল হারাম নির্মাণের ৪০ বছর পরে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়। (Dhakapost)
কে প্রথম এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন?
এই বিষয়ে আলেমদের কয়েকটি মত রয়েছে। একদল ইতিহাসবিদ মনে করেন, আল আকসা মসজিদ মূলত হজরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমেই তৈরি হয়, যা পরবর্তী নবীরা পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করেন। (Bangla News 24)
বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রতিষ্ঠা হয় মুসলিম জাতির বাবা হজরত ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক পবিত্র কাবা নির্মাণের ৪০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর। তার নাতি বনি ইসরায়েলের প্রথম নবী হজরত ইয়াকুব (আ.) ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ শহর জেরুজালেমে মসজিদ আল-আকসা নির্মাণ করেন। অতঃপর হজরত সুলায়মান (আ.) এ পবিত্র মসজিদ পুনর্নির্মাণ করেন। (Protidiner Sangbad)
অর্থাৎ এই পবিত্র ভূমির সাথে জড়িয়ে আছে হজরত আদম (আ.), ইবরাহিম (আ.), ইয়াকুব (আ.) এবং সুলায়মান (আ.)-এর মতো মহান নবীদের নাম — যারা সবাই মুসলিম উম্মাহর আদর্শ পূর্বপুরুষ।
কুরআনে মসজিদুল আকসার উল্লেখ — ইসরা ও মিরাজের ঘটনা
মসজিদুল আকসার মর্যাদার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো — আল্লাহ তা'আলা নিজে পবিত্র কুরআনে এই মসজিদের নাম উল্লেখ করেছেন। সূরা বনী-ইসরাঈলের প্রথম আয়াতে আল্লাহ বলেন:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ
"পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চতুর্পার্শ্বকে আমি বরকতময় করেছি।" — (সূরা বনী-ইসরাঈল: ১)
এই একটি আয়াতেই তিনটি বিশাল সত্য প্রকাশ পাচ্ছে। প্রথমত, আল্লাহ নিজে মসজিদুল আকসাকে 'বারাকাতময়' বলে ঘোষণা করেছেন। দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাজের সফরের সূচনাবিন্দু ছিল এই মসজিদ। তৃতীয়ত, এই মসজিদ শুধু একটি ইমারত নয়, এটি আল্লাহর বিশেষ নিদর্শনের অংশ।
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত সফরকে 'ইসরা' এবং মসজিদুল আকসা থেকে আরশে আজিমে সফরকে মিরাজ বলা হয়। (Wikipedia)
মিরাজের রাতে যা ঘটেছিল আল-আকসায়
মিরাজের রাতের ঘটনা প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গেঁথে আছে। মসজিদে আকসার গুরুত্ব বোঝার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, মেরাজ রজনীতে আমাদের নবীজী ঊর্ধ্বজগতের সফর শুরু করার পূর্বে জিবরীল আমীনের সাথে প্রথমে এই মসজিদে এসেছেন এবং নামাজ আদায় করেছেন। তিনি ইমামতি করেছেন আর সমস্ত নবীগণ তাঁর ইকতিদা করেছেন। (Alkawsar)
ভাবুন একবার — পৃথিবীর সমস্ত নবী-রাসূল সেই রাতে একত্রিত হয়েছিলেন আল-আকসায়। আর আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁদের ইমামতি করেছিলেন। এর চেয়ে বড় সম্মান এই মসজিদের জন্য আর কী হতে পারে?
এই মিরাজের মাধ্যমেই ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের দ্বিতীয় স্তম্ভ অর্থাৎ নামাজ মুসলমানদের জন্য অত্যাবশ্যক (ফরজ) নির্ধারণ করা হয় এবং দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নির্দিষ্ট করা হয়। (Wikipedia) অতএব প্রতিদিন যখন আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি, প্রতিবারই আমরা এই মহান মসজিদের সাথে এক অদৃশ্য সুতায় যুক্ত হয়ে পড়ি।
মুসলমানদের প্রথম কিবলা
আল আকসা মসজিদের গুরুত্বের আরও একটি বড় কারণ হলো প্রথম থেকে হিজরত পরবর্তী ১৭ মাস পর্যন্ত মুসলমানরা আল আকসা মসজিদের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। পরবর্তীতে মহান আল্লাহর নির্দেশে মুসলমানদের কেবলা মক্কার দিকে পরিবর্তিত হয়। (Bangla News 24)
নবী কারীম (সা.) যখন প্রথম মদীনায় এলেন, তাঁর মামাদের বাড়িতে মেহমান হলেন। আর তিনি বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে ১৬ থেকে ১৭ মাস পর্যন্ত নামাজ আদায় করেছেন। (Alkawsar) ইসলামের সেই প্রথম দিনগুলোতে প্রতিটি নামাজে মুসলমানরা যে দিকে মুখ করতেন — সেই পবিত্র দিকটি ছিল আল-আকসার দিক। এই ইতিহাস আল-আকসাকে মুসলিম হৃদয়ে এক অনন্য স্থান দিয়েছে।
হাদিসে বিশেষ সফরের মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন:
"তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও (ইবাদতের নিয়তে) সফর করা যাবে না — মসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ (মসজিদে নববি) এবং মসজিদুল আকসা।" — (সহীহ বুখারি: ১১৮৯, সহীহ মুসলিম: ১৩৯৭)
নবী করিম (সা.) তিনটি মসজিদের কথা বলেছেন, যথা মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববি ও মসজিদুল আকসার উদ্দেশে সফরকে বিশেষ পুণ্যময় কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যা অন্য কোনো মসজিদ সম্পর্কে করেননি। (Deshrupantor)
পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মসজিদ আছে। কিন্তু এই তিনটি মসজিদকে রাসূল (সা.) আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন। এটিই প্রমাণ করে মসজিদুল আকসার অতুলনীয় মর্যাদা।
নবী-রাসূলদের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র ভূমি
বায়তুল মোকাদ্দাস মসজিদ এবং তার আশপাশের এলাকা বহু নবীর স্মৃতিবিজড়িত। (Bangla News 24) ফিলিস্তিনের এই ভূখণ্ডে বহু নবী-রাসূল বাস করেছেন, দাওয়াতের কাজ করেছেন এবং আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করেছেন।
মসজিদে আকসা নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত আদম (আ.), হজরত ইয়াকুব (আ.), হজরত সুলায়মান (আ.)-এর নাম। জড়িয়ে আছে প্রায় অর্ধ জাহানের মুসলিম শাসক হজরত ওমর (রা.) এবং এরপর সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবীসহ অসংখ্য বীরের নাম। (Dhaka Mail)
এই ভূমি যেন ইসলামের ইতিহাসের এক জীবন্ত পাঠ্যপুস্তক। প্রতিটি পাথরে, প্রতিটি দেয়ালে লেখা আছে হাজার বছরের বিশ্বাস আর ত্যাগের গল্প।
উমর (রা.)-এর জেরুজালেম বিজয় এবং মসজিদ নির্মাণ
৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) জেরুজালেম জয় করেন। মেরাজের রাতে রাসূল (সা.)-এর আল আকসায় আগমনের মধ্য দিয়ে ইসলামি যুগের সূচনা হয়। হিজরী ১৪ সালে খলীফা উমর (রা.) ফিলিস্তিন বিজয়ের পরে প্রথমে এখানে মসজিদে উমর নির্মাণ করেন। (Dhakapost)
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো — উমর (রা.) জেরুজালেম বিজয়ের পরে কোনো রক্তপাত ঘটাননি, কোনো গির্জা ভাঙেননি, কোনো ইহুদিকে তাড়িয়ে দেননি। বরং তিনি সকল ধর্মের মানুষের জন্য উপাসনার স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন। এটিই ইসলামের উদারতার সত্যিকারের পরিচয়।
ক্রুসেডারদের দখল ও সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর মুক্তি
১৫ জুলাই ১০৯৯ সাল — ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এক বেদনাদায়ক দিন। সেদিন ক্রুসেডার বাহিনী সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিন দখল করে। (Protidiner Sangbad) ক্রুসেডাররা জেরুসালেম দখল করার পর তারা মসজিদটিকে একটি প্রাসাদ এবং একই প্রাঙ্গণে অবস্থিত কুব্বাত আস-সাখরাকে গির্জা হিসেবে ব্যবহার করত। (Wikipedia)
প্রায় এক শতাব্দী ধরে মুসলমানরা তাদের প্রিয় মসজিদ থেকে বঞ্চিত ছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা সেই অন্ধকার যুগে একজন বীরের জন্ম দিয়েছিলেন — সালাহউদ্দিন আইয়ুবী।
২ অক্টোবর ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে সেনাপতি ও গভর্নর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীবেশে বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করেন। (Protidiner Sangbad) বিজয়ের পরে তিনি প্রতিশোধ নেননি, হত্যাযজ্ঞ চালাননি — বরং মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
আধুনিক যুগে আল-আকসার পরিস্থিতি
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আল আকসার নিয়ন্ত্রণ হারায় মুসলমানরা। (Dhakapost) বর্তমানে পুরনো শহর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে মসজিদটি জর্ডানি/ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন ইসলামি ওয়াকফের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। (Wikipedia)
বর্তমানে আকসা কমপ্লেক্স ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মসজিদ পরিচালিত হয় জর্ডান-ফিলিস্তিনের একটি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে। যদিও এর প্রবেশপথগুলোতে মোতায়েন করা থাকে দখলদার সেনারা। (Dhaka Mail) ১৯৬৯ সালে মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছিল — যা সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে শোকে মুষড়ে দিয়েছিল।
মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব কী?
উপরের আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল, আল-আকসা বা বাইতুল মাকদিস ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ আর মুসলিম উম্মাহর জন্য কতই না গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গোটা মুসলিম উম্মাহ আল-আকসার বিষয়ে দায়িত্বহীনতার শিকার হয়ে পড়েছে। (Alkawsar)
আমাদের দায়িত্ব বহুমাত্রিক। প্রথমত, আল-আকসার সঠিক ইতিহাস ও গুরুত্ব জানা এবং পরিবার-সন্তানদের জানানো। কারণ যে জাতি তার ঐতিহ্য ভুলে যায়, সে জাতি পথ হারায়। দ্বিতীয়ত, ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য প্রতিদিন দোয়া করা। দোয়া একজন মুসলমানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। তৃতীয়ত, সামর্থ্য অনুযায়ী ফিলিস্তিনের মানুষের পাশে দাঁড়ানো — মানবিক সাহায্যের মাধ্যমে হোক বা সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে হোক। আল-আকসার তাৎপর্য ভৌগোলিক, ধর্মীয় এবং ভাষাগত সীমানা অতিক্রম করে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করার কারণ হিসেবে কাজ করে। (RisingBD)
মসজিদুল আকসা শুধু ইট-পাথরের একটি স্থাপনা নয়। এটি হাজার বছরের নবুয়্যতের ইতিহাস, লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্ত, কোটি কোটি মুসলমানের আবেগ আর আল্লাহর বিশেষ বরকতের প্রতীক। কুরআন যে মসজিদকে 'বারাকাতময়' বলেছে, যে মসজিদে আমাদের নবী (সা.) সকল নবীদের ইমামতি করেছেন, যে মসজিদের দিকে মুখ করে মুসলমানরা ১৭ মাস নামাজ আদায় করেছেন — সেই মসজিদকে আমরা কখনো ভুলতে পারি না, ভুলব না।
আল্লাহ তা'আলা মসজিদুল আকসাকে হেফাজত করুন, ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মুসলমানদের সাহায্য করুন এবং এই উম্মাহকে তার দায়িত্ব পালনের তাওফিক দিন।
আমিন।
তাওয়াক্কুল কী?
'তাওয়াক্কুল' (توكل) শব্দটি আরবি 'ওয়াকালা' ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ কাউকে দায়িত্ব অর্পণ করা বা প্রতিনিধি বানানো। ইসলামি পরিভাষায় তাওয়াক্কুল হলো— নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা-পরিশ্রম করার পর সম্পূর্ণ ফলাফল আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া এবং এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে একমাত্র তিনিই সর্বোত্তম ব্যবস্থাকারী।
বিখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন: তাওয়াক্কুলের অর্থ কর্ম ত্যাগ নয়, বরং কর্মের পাশাপাশি অন্তরকে আল্লাহর সাথে যুক্ত রাখা। যে ব্যক্তি চেষ্টা না করে শুধু তাওয়াক্কুলের দাবি করে, সে আসলে তাওয়াক্কুলকেই ভুল বুঝেছে।
কুরআনের আলোয় তাওয়াক্কুল
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বারবার তাওয়াক্কুলের নির্দেশ দিয়েছেন এবং মুতাওয়াক্কিলদের বিশেষ মর্যাদার কথা জানিয়েছেন।
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর কাজ সম্পন্ন করেন।" — (সূরা তালাক: ৩)
এই আয়াতে 'হাসবুহু' শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক— অর্থ হলো আল্লাহ একাই তার জন্য সব দিক থেকে যথেষ্ট।
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।" — (সূরা আলে-ইমরান: ১৫৯)
আল্লাহ নিজে বলছেন তিনি তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন— এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?
হাদিসের আলোয় তাওয়াক্কুল
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যদি তোমরা আল্লাহর উপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদের সেইভাবে রিজিক দিতেন যেভাবে পাখিদের রিজিক দেন— তারা ভোরে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেট ভরে ফিরে আসে।"
— তিরমিযি: ২৩৪৪
এই হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— পাখি কিন্তু বাসায় বসে থাকে না, সে উড়ে যায়, চেষ্টা করে। কিন্তু তার ভরসা থাকে শুধু আল্লাহর উপর।
"যখন তোমরা ঘর থেকে বের হও তখন বলো: 'বিসমিল্লাহ, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।' যে এটা বলে তাকে বলা হয়— তোমাকে সঠিক পথ দেখানো হলো, তোমাকে রক্ষা করা হলো।"
— আবু দাউদ: ৫০৯৫
তাওয়াক্কুল ও চেষ্টার সম্পর্ক
একবার এক সাহাবি উট না বেঁধে মসজিদে আসলেন। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, "উট কোথায়?" সাহাবি বললেন, "আল্লাহর উপর ভরসা করে ছেড়ে দিয়েছি।" রাসূল (সা.) বললেন:
"প্রথমে উট বাঁধো, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করো।" — তিরমিযি: ২৫১৭
এই একটি হাদিস সব পরিষ্কার করে দেয়— চেষ্টা + আল্লাহর উপর ভরসা = প্রকৃত তাওয়াক্কুল। চেষ্টা ছাড়া শুধু মুখে ভরসার কথা বলা আসলে অলসতার আবরণ মাত্র।
তাওয়াক্কুলের তিনটি স্তর
আলেমগণ তাওয়াক্কুলকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন:
প্রথম স্তর: বান্দা জানে যে আল্লাহই একমাত্র রব এবং তিনিই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। এই জ্ঞান অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করাই প্রথম ধাপ।
দ্বিতীয় স্তর: বিপদ এলে ধৈর্য হারায় না, বরং আল্লাহর পরিকল্পনার উপর আস্থা রাখে। এই স্তরে পৌঁছানো কঠিন, কিন্তু যে তাওয়াক্কুল শিখেছে সে জানে— "এই কষ্টও আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ।"
তৃতীয় স্তর: সুখ-দুঃখ উভয় অবস্থায় আল্লাহর প্রতি সমান সন্তুষ্ট থাকা। এই স্তর অর্জন করেছিলেন নবী-রাসূলগণ। ইব্রাহিম (আ.) আগুনে নিক্ষিপ্ত হলেও অন্তর শান্ত ছিল— কারণ তিনি জানতেন, আল্লাহ তাঁর রব।
তাওয়াক্কুলের অলৌকিক ফল
আল্লাহ কুরআনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করেনি।" — (সূরা তালাক: ২-৩)
'মিন হায়সু লা ইয়াহতাসিব'— যেখান থেকে সে ভাবতেও পারেনি। কত মানুষ বলেন— "জানি না কীভাবে হয়ে গেল, কিন্তু হয়ে গেল।" এটাই আল্লাহর গায়েবী সাহায্য।
আধুনিক জীবনে তাওয়াক্কুলের প্রয়োগ
আজকের উদ্বেগপূর্ণ দুনিয়ায় তাওয়াক্কুল একটি অপরিহার্য ওষুধ। মানসিক চাপ ও হতাশার মূল কারণ হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং নিজের উপর সীমাতিরিক্ত নির্ভরতা।
চাকরির পরীক্ষায় পুরোপুরি প্রস্তুতি নিন, তারপর ফলাফল আল্লাহর উপর ছেড়ে দিন। ব্যবসায় সৎভাবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন, মুনাফা-লোকসান আল্লাহর ইচ্ছার উপর ন্যস্ত করুন। চিকিৎসা নিন, ওষুধ খান, কিন্তু শিফা দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর— এই বিশ্বাস রাখুন। যে মানুষ এই মানসিকতা গড়ে তুলতে পারে, সে পৃথিবীর কোনো ব্যর্থতাকে চূড়ান্ত মনে করে না।
তাওয়াক্কুল কোনো দুর্বলের আশ্রয় নয়— এটি সত্যিকারের শক্তিশালী মানুষের বৈশিষ্ট্য। যে মানুষ আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে শিখেছে, সে পৃথিবীর কোনো পরিস্থিতিতেই ভেঙে পড়ে না। সে জানে— ঝড় আসবে, কিন্তু আল্লাহ আছেন।
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
"আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কার্যনির্বাহী।" — (সূরা আলে-ইমরান: ১৭৩)
আল্লাহুম্মা তাওয়াক্কালতু আলাইক — আমিন।
মানুষ দুনিয়ায় অর্থ, খ্যাতি, ক্ষমতা বা লোকরঞ্জনের লোভে নানা কাজ করে থাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে জাগতিক বা লৌকিক উদ্দেশ্যে করা এসব কাজকে ‘রিয়া’ বা লোকদেখানো আমল বলা হয়। বিশিষ্ট আলেম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ জানিয়েছেন, রিয়াদুষ্ট কোনো কাজ যত মহৎই হোক না কেন, তা মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
রোববার (১১ জানুয়ারি, ২০২৬) প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, মুমিনের প্রতিটি কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
রিয়া ও আমল কবুল না হওয়া
হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মাওলানা মাসঊদ জানান, কোনো মহৎ কাজে যদি বিন্দুমাত্র লোকরঞ্জন অভিলাষ থাকে, তবে তা আল্লাহ কবুল করেন না। কিয়ামতের দিন খ্যাতিমান আলেম, দানশীল এবং শহীদকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, যদি তাদের সেই কাজের পেছনে আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে দুনিয়াবি খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্য থাকে (সহিহ মুসলিম)।
আমল কবুলের শর্ত ‘ইখলাস’
নিবন্ধে বলা হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা অল্প কাজও নাজাতের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা দ্বিনকে খালিস ও নির্ভেজাল করো, অল্প আমলই তোমার জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচ্য হবে।’
কোরআন ও হাদিসের আলোকে তিনি উল্লেখ করেন:
সাহাবিদের দৃষ্টান্ত
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহাবিদের উদাহরণ টেনে বলেন, সাহাবিরা ‘ইখলাস’ বা নিয়তের পরিশুদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে ছিলেন। তাই আল্লাহ পবিত্র কোরআনে তাঁদের ব্যাপারে সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, ‘আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট, তারাও আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট’ (সুরা তাওবা: ১০০)।
সুতরাং, মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজের মূল চালিকাশক্তি হতে হবে কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টি।
মুফতি সাইফুল ইসলাম
মানুষ স্বভাবগতভাবেই সহমর্মী। তবে সমাজের বাস্তবতায় বিধবা নারী ও অসহায় দরিদ্র শ্রেণি প্রায়শই অবহেলার শিকার হন। পরিবার হারানোর বেদনা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় তাদের জীবন হয়ে ওঠে সংগ্রামমুখর। ইসলাম এই দুর্বল ও অসহায় মানুষদের কষ্টকে কেবল মানবিক অনুভূতির বিষয় হিসেবে দেখেনি, বরং একে ঈমানের গভীরতার মানদণ্ড হিসেবে স্থাপন করেছে।
কোরআন ও সুন্নাহতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সমাজের প্রান্তিক মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করা অনেক উচ্চ মর্যাদার ইবাদত।
হাদিসের আলোকে মর্যাদা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিধবা ও মিসকিনদের সহায়তাকারীকে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন:
‘যে ব্যক্তি বিধবা ও মিসকিনের ভরণ-পোষণের জন্য চেষ্টা করে, সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো; অথবা সে ওই ব্যক্তির মতো, যে দিনে রোজা রাখে এবং রাতে ইবাদতে দণ্ডায়মান থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০০৬)
এই হাদিসের মাধ্যমে সমাজসেবাকে ইবাদতের সর্বোচ্চ স্তর—জিহাদ, সিয়াম ও কিয়ামের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, নিঃস্বার্থভাবে মানুষের কষ্ট লাঘব করা ইসলামে কোনো গৌণ কাজ নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের শক্তিশালী মাধ্যম।
কোরআনের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনেও অসহায়দের জন্য ব্যয়ের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
‘তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে—কী ব্যয় করবে? বলো, যা কিছু ব্যয় করবে, তা হবে পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য।’ (সুরা: বাকারা, আয়াত: ২১৫)
অন্য আয়াতে নেককারদের গুণাবলি বর্ণনায় বলা হয়েছে:
‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় খাদ্য দান করে মিসকিন, ইয়াতিম ও বন্দিদের।’ (সুরা: আল-ইনসান, আয়াত: ৮)
ইসলামি স্কলারদের অভিমত
বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইবনে হাজর আল-আসকালানি (রহ.) তাঁর ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, বিধবা ও মিসকিনের সেবাকে জিহাদের সঙ্গে তুলনা করার কারণ হলো—এতে রয়েছে অবিরাম চেষ্টা, ধৈর্য ও আত্মত্যাগ, যা নফসের বিরুদ্ধে এক প্রকার সংগ্রাম। নিয়ত বিশুদ্ধ হলে এই সেবা ধারাবাহিক ইবাদতে পরিণত হয়।
বাস্তব দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা
ইসলামের ইতিহাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা এই শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ দেখিয়েছেন। খলিফা ওমর (রা.) রাতের আঁধারে অসহায়দের জন্য নিজের কাঁধে খাদ্য বহন করতেন, যা কেবল শাসকের দায়িত্ব নয়, ঈমানি দায়বদ্ধতারও প্রমাণ।
প্রকৃত ধার্মিকতা কেবল মসজিদকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়া এবং বিধবার চোখের অশ্রু মোছাও ইবাদত। আমাদের ঈমানি দায়িত্ব হলো সমাজের এই অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের মুখে হাসি ফোটানো।
ইসলাম ধর্মে ক্ষমাকে একটি মহৎ গুণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অন্যের অপরাধ মার্জনা করা, ক্রোধ সংবরণ করা এবং প্রতিশোধ না নেওয়াকে ক্ষমা বলা হয়। ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে ক্ষমার চর্চা যেমন শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখে, তেমনি অন্যকে ক্ষমা করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছ থেকে নিজের গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়া সম্ভব।
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ক্ষমার ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে মুমিনদের ক্ষমার পথ অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা তাগাবুনে (আয়াত: ১৪) বলা হয়েছে, ‘আর যদি তোমরা তাদের মার্জনা করো, দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করো এবং ক্ষমা করো, তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান।’
সুরা নিসায় (আয়াত: ১৪৯) আল্লাহ আরও বলেন, ‘যদি তোমরা কোনো সৎকর্ম প্রকাশ করো বা গোপন করো কিংবা কোনো অপরাধ মার্জনা করো, তাহলে আল্লাহ নিশ্চয়ই মার্জনাকারী ও সর্বশক্তিমান।’
হজরত আবু বকর (রা.) ও সুরা নূরের শিক্ষা
ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)-এর জীবনের একটি ঘটনা ক্ষমার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনাকারীদের সঙ্গে শরিক থাকার কারণে আবু বকর (রা.) তাঁর আত্মীয় ও অভাবগ্রস্ত সাহাবি মিসতা বিন আসাসা (রা.)-কে আর আর্থিক সাহায্য না করার কসম করেছিলেন।
তখন আল্লাহ তাআলা সুরা নূরের ২২ নম্বর আয়াত নাজিল করেন। যেখানে বলা হয়, ‘তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? বস্তুত আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াবান।’
এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর আবু বকর (রা.) বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই আমি চাই যে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।’ এরপর তিনি সঙ্গে সঙ্গে কসম ভঙ্গ করেন এবং মিসতাকে (রা.) আগের মতোই সহযোগিতা করা শুরু করেন।
পরকালে মুক্তির উপায়
দুনিয়াতে মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়ার বিনিময়ে পরকালে আল্লাহর ক্ষমা লাভের সুসংবাদ দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের ভুল ক্ষমা করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার ভুল ক্ষমা করবেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৯৯)
অর্থাৎ, মহান আল্লাহর ভালোবাসা ও পরকালীন মুক্তি পেতে হলে মানুষকে ক্ষমা করার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি।
প্রকৃত আধ্যাত্মিক সাধনা শরিয়ত ছাড়া অসম্ভব এবং শরিয়তবিহীন মারেফতের দাবিদাররা শয়তানের অনুসারী বলে মন্তব্য করেছেন দেশের শীর্ষ আলেম, আল হাইআতুল উলয়া ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি আল্লামা মাহ্মূদুল হাসান। তিনি বলেছেন, যারা বলে আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য শরিয়ত বা কোরআন তিলাওয়াতের প্রয়োজন নেই, তারা মূলত ইসলামবিরোধী এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) এক নিবন্ধে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনা, ভন্ড পীরদের দৌরাত্ম্য এবং মসজিদের আদব রক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পেশ করেন।
ভন্ড পীর ও নারীদের সঙ্গে প্রতারণা
আল্লামা মাহ্মূদুল হাসান বলেন, সমাজে এমন বহু মানুষ আছে যারা কোরআন পড়তে পারে না, মাসআলা জানে না, এমনকি নামাজ-পর্দাও করে না; অথচ তারা নিজেদের বড় আধ্যাত্মিক সাধক বা পীর দাবি করে। এরা মূলত হাদিয়া বা টাকার লোভে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এরা নারীদের সামনে এনে ঝাড়ফুঁক করে এবং তাদের ‘মারেফতি বোন’ বলে দাবি করে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। হাক্কানি আলেমরা এর প্রতিবাদ করলে তাদের ইসলামের শত্রু বলে আখ্যায়িত করা হয়। মূলত প্রকৃত পীরের মধ্যে অবশ্যই শরিয়তের পূর্ণ অনুসরণ থাকতে হবে।’
কোরআন ছাড়া সাধনা অসম্ভব
আধ্যাত্মিকতার জন্য কোরআন শিক্ষা অপরিহার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দোতলায় উঠতে হলে যেমন প্রথম তলার সিঁড়ি ব্যবহার করতে হয়, তেমনি আত্মিক সাধনার প্রথম সিঁড়ি হলো কোরআন তিলাওয়াত। যারা বলে কোরআন ছাড়া মারেফত হাসিল হয়, তারা ইহুদি, খ্রিস্টান বা কাদিয়ানিদের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী।’
বেয়াদবি ও ইবাদতের ভুল ব্যাখ্যা
ইবাদতের নামে অনেকে শরিয়তবিরোধী কাজ করে অজান্তে বেয়াদবি করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আজান চলাকালীন কোরআন তিলাওয়াত করা বা জুমার খুতবার সময় তাহিয়্যাতুল মসজিদের নামাজ পড়া বেয়াদবি ও গুনাহের কাজ। আল্লাহ ও রাসুলের (সা.) আদেশ না মানাই হলো বড় বেয়াদবি।’
মসজিদের দেয়ালে পোস্টার লাগানো কবিরা গুনাহ
মসজিদের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষার ওপর জোর দিয়ে আল্লামা মাহ্মূদুল হাসান বলেন, জনগণের টাকায় রং করা মসজিদ বা মাদ্রাসার দেয়ালে পোস্টার লাগানো ‘কবিরা গুনাহ’। তিনি বলেন, ‘এটি মানুষের হক নষ্ট করার শামিল। ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিলের পোস্টারও মসজিদের দেয়ালে লাগানো বৈধ নয়।’
এছাড়া মসজিদে জুতা রাখা ও থুতু-ময়লা ফেলার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, জুতার নিচের ময়লা বা নাকের ময়লা দিয়ে মসজিদ অপরিচ্ছন্ন করা ভয়াবহ গুনাহের কাজ। পরকালে এই ময়লা পাহাড় সমান হয়ে অপরাধীকে চাপা দেবে বলে হাদিসে হুঁশিয়ারি রয়েছে।
মানুষের জীবন এক সরলরেখায় চলে না। জীবনে সুখ যেমন আছে, দুঃখও তেমন আছে। কখনো আকাশছোঁয়া সফলতা আমাদের আনন্দ দেয়, আবার কখনো ঘোর অমানিশার মতো বিপদ আমাদের ঘিরে ধরে। যখন চাকরি চলে যায়, ব্যবসায় ধস নামে, আপনজন হারিয়ে যায় কিংবা দুরারোগ্য ব্যাধিতে শরীর ভেঙে পড়ে—তখন মানুষ হিসেবে আমরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। মনে হয়, পৃথিবীর সব আলো নিভে গেছে।
কিন্তু একজন মুমিন বা বিশ্বাসীর জন্য এই হতাশা কখনোই স্থায়ী হতে পারে না। ইসলামের দৃষ্টিতে বিপদ-আপদ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রধান দুটি হাতিয়ার হলো—সবর (ধৈর্য) এবং তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা)। আজকের আর্টিকেলে আমরা কুরআন ও হাদিসের আলোকে জানব, কীভাবে কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করতে হয় এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায়।
'সবর' একটি আরবি শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ হলো বিরত রাখা বা বাধা দেওয়া। ইসলামি পরিভাষায়, জীবনের যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে স্থির রাখা, আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং অভিযোগ না করে পরিস্থিতির মোকাবিলা করাকেই সবর বলা হয়।
অনেকে মনে করেন, হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার নাম ধৈর্য। এটি ভুল ধারণা। ইসলামে ধৈর্যের তিনটি স্তর রয়েছে:
১. ইবাদতের ক্ষেত্রে ধৈর্য: নিয়মিত নামাজ, রোজা এবং অন্যান্য ইবাদত পালনে কষ্ট স্বীকার করা।
২. পাপ থেকে বিরত থাকার ধৈর্য: নফস বা প্রবৃত্তি পাপ কাজ করতে চাইলেও আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সংবরণ করা।
৩. বিপদ-আপদে ধৈর্য: রোগ-শোক, অভাব-অনটন বা যে কোনো মুসিবতে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে শান্ত থাকা।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩)
“হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”
(সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩)
অনেক সময় আমরা বিপদে পড়লে ভাবি, "আল্লাহ কেন আমাকেই কষ্ট দিচ্ছেন? আমি তো কোনো ক্ষতি করিনি।" এই ভাবনাটি শয়তানের প্ররোচনা। মনে রাখতে হবে, দুনিয়াটা জান্নাত নয়; এটি একটি পরীক্ষাকেন্দ্র (Exam Hall)। এখানে পদে পদে পরীক্ষা দিতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-মুলক এর শুরুতে বলেছেন, তিনি জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন কে আমল বা কর্মে শ্রেষ্ঠ তা পরীক্ষা করার জন্য। আবার সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন:
“আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।”
সুতরাং, বিপদ আসা মানেই আল্লাহ আপনার ওপর রাগান্বিত—বিষয়টি এমন নয়। বরং নবীদের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। তাই বিপদ এলে বুঝতে হবে, আল্লাহ আপনার ঈমানের দৃঢ়তা যাচাই করছেন অথবা আপনার গুনাহ মাফ করে পরকালের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চাইছেন।
ধৈর্যের পরই আসে ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর ভরসা করার বিষয়টি। তাওয়াক্কুল মানে হলো—সাধ্যমতো চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
ধরুন, আপনি অসুস্থ। এখন ডাক্তার দেখানো, ওষুধ খাওয়া এবং স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া হলো আপনার চেষ্টা। আর সুস্থ করার মালিক আল্লাহ—এই বিশ্বাস রাখা হলো তাওয়াক্কুল। চেষ্টা না করে ঘরে বসে থেকে "আল্লাহ ভরসা" বলা বোকামি, আবার শুধু চেষ্টার ওপর নির্ভর করে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া হলো অহংকার।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” (সূরা তালাক, আয়াত: ৩)
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।”
(সূরা তালাক, আয়াত: ৩)
যখন আপনি বিশ্বাস করবেন যে, আমার জীবনের নিয়ন্ত্রণ আমার রবের হাতে এবং তিনি যা করবেন তাতেই আমার কল্যাণ নিহিত—তখন পৃথিবীর কোনো ডিপ্রেশন বা এনজাইটি আপনাকে গ্রাস করতে পারবে না।
কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করা সহজ নয়, কিন্তু আমরা যদি নবীদের জীবনের দিকে তাকাই, তবে অনুপ্রেরণা পাব।
১. আইয়ুব (আ.)-এর অসুস্থতা:
হযরত আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর সম্পদ ধ্বংস হয়েছিল, সন্তানরা মারা গিয়েছিল। কিন্তু তিনি কখনো আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। তিনি শুধু বলেছিলেন, "আমাকে দুঃখ স্পর্শ করেছে, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।" আল্লাহ তাঁর ধৈর্য দেখে তাঁকে পুনরায় সুস্থতা ও দ্বিগুণ সম্পদ দান করেছিলেন।
২. ইউসুফ (আ.)-এর কারাভোগ:
ছোটবেলায় ভাইদের দ্বারা কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এরপর দাস হিসেবে বিক্রি হওয়া, মিথ্যা অপবাদে বছরের পর বছর জেল খাটা—ইউসুফ (আ.)-এর জীবন ছিল ট্র্যাজেডিতে ভরা। কিন্তু তিনি সবর ও তাওয়াক্কুল ছাড়েননি। ফলাফলস্বরূপ, আল্লাহ তাঁকে মিশরের রাজক্ষমতা দান করেছিলেন।
৩. ইয়াকুব (আ.)-এর কান্না:
প্রিয় পুত্র ইউসুফকে হারিয়ে পিতা ইয়াকুব (আ.) কেঁদে কেঁদে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, "ফাসাবরুন জামিল"—অর্থাৎ, "উত্তম ধৈর্যই আমার শ্রেয়।" তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি এবং শেষ পর্যন্ত হারানো সন্তানকে ফিরে পেয়েছিলেন।
আপনি যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন বা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন, তখন নিচের ৫টি আমল আপনার হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দিতে পারে:
১. নামাজের প্রতি যত্নবান হোন:
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো সংকটে পড়তেন, তখনই নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। সিজদাহ হলো আল্লাহর সবচেয়ে কাছে যাওয়ার মাধ্যম। সিজদায় গিয়ে আপনার মনের সব কথা আল্লাহকে খুলে বলুন।
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা:
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না এবং তার সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেন। 'আস্তাগফিরুল্লাহ' পাঠের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৩. ইউনুস (আ.)-এর দোয়া পড়া:
বিপদ থেকে মুক্তির জন্য মাছের পেটে থাকা অবস্থায় ইউনুস (আ.) যে দোয়াটি পড়েছিলেন, তা অত্যন্ত শক্তিশালী।
দোয়াটি হলো: “লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জঅলিমিন।”
অর্থ: "আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।"
৪. সাদাকাহ বা দান করা:
দান-সাদাকাহ বিপদ-আপদ দূর করে এবং আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে। সাধ্যমতো গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করুন, এটি আপনার বিপদ মুক্তির ওসিলা হতে পারে।
৫. কুরআনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন:
কুরআন হলো অন্তরের শিফা। হতাশার সময় সূরা আদ-দুহা, সূরা আলাম-নাসরাহ (ইনশিরাহ) এবং সূরা ইউসুফ অর্থসহ পড়ুন। দেখবেন, মনের ভার অনেক হালকা হয়ে গেছে।
আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যশীলদের জন্য এমন পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন, যা অন্য কোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে দেননি। সাধারণত প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ধৈর্যের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন:
“ধৈর্যশীলদের তো অপরিমিত (বিনা হিসাবে) পুরস্কার দেওয়া হবে।” (সূরা জুমার, আয়াত: ১০)
“ধৈর্যশীলদের তো অপরিমিত (বিনা হিসাবে) পুরস্কার দেওয়া হবে।”
(সূরা জুমার, আয়াত: ১০)
এছাড়া, দুনিয়াতেও কষ্টের পরে স্বস্তি আসে। আল্লাহ সূরা ইনশিরাহে দুইবার করে জোর দিয়ে বলেছেন, “নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।” তাই আজকের এই রাত যত অন্ধকারই হোক না কেন, আগামীকাল ভোরের সূর্য উদিত হবেই।
জীবন মানেই যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে হার-জিত থাকবে, সুখ-দুঃখ থাকবে। কিন্তু মুমিন হিসেবে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। আজকের এই কঠিন সময়টাও একসময় স্মৃতি হয়ে যাবে।
যদি আপনি এখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যান, তবে ভেঙে পড়বেন না। চোখের পানি মুছুন, ওযু করে জায়নামাজে দাঁড়ান এবং রবের ওপর ভরসা করুন। মনে রাখবেন, আল্লাহ কাউকেই তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না। আপনার ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাসই আপনাকে এই ঝড় থেকে নিরাপদে তীরে ভিড়াবে, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে কঠিন সময়ে ‘সবরে জামিল’ বা উত্তম ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে ভোগবাদ (Consumerism) এবং বস্তুবাদ মানুষের প্রধান চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ যত বেশি যান্ত্রিক সুখের পেছনে ছুটছে, ততই তার ভেতরটা বিষণ্ণতায় ভরে উঠছে। ইসলাম এখানে আমাদের শেখায় যে, প্রকৃত সুখ বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়, বরং স্রষ্টার সন্তুষ্টি এবং আত্মার প্রশান্তিতে নিহিত। আল-কুরআনে এরশাদ হয়েছে:
"জেনে রেখো, কেবল আল্লাহর জিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।" (সূরা আর-রাদ: ২৮)
অনেকেই মনে করেন শুধু নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত পালনই ইসলাম। কিন্তু ইসলামের পরিধি এর চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনা।
ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাজকিয়াতুন নাফস বা আত্মশুদ্ধি। মানুষের হৃদয়ে যখন হিংসা, অহংকার, রিয়া (লোক দেখানো মনোভাব) এবং লোভ বাসা বাঁধে, তখন সে ব্যক্তি ও সমাজের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "শরীরে একটি মাংসপিণ্ড আছে, যদি তা সংশোধিত হয় তবে পুরো শরীর সংশোধিত হয়; আর যদি তা কলুষিত হয় তবে পুরো শরীর কলুষিত হয়—আর তা হলো কলব বা অন্তর।"
আত্মশুদ্ধির প্রধান কয়েকটি ধাপ হলো:
ইসলামি সমাজব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার। ইসলাম শিখিয়েছে যে, সাদা বা কালোর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, আরবের ওপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো 'তাকওয়া' বা খোদাভীতি। মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে মানবাধিকারের যে রূপরেখা দিয়েছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার মজুরি পরিশোধ করা এবং এতিম-অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর যে তাগিদ ইসলাম দিয়েছে, তা আধুনিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।
একটি সুন্দর সমাজ গড়ার প্রাথমিক একক হলো পরিবার। ইসলামে মা-বাবার অধিকার, স্ত্রীর মর্যাদা এবং সন্তানদের সঠিক লালন-পালনের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ, যে তার পরিবারের কাছে শ্রেষ্ঠ।" পারিবারিক বন্ধন যদি দৃঢ় হয়, তবে সমাজ থেকে অপরাধ এবং বিশৃঙ্খলা অনেকাংশেই হ্রাস পায়।
অনেকে মনে করেন ইসলাম ও বিজ্ঞান সাংঘর্ষিক, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মধ্যযুগে মুসলিম বিজ্ঞানীরাই আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, ভ্রূণতত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং সমুদ্রবিজ্ঞান নিয়ে এমন সব তথ্য দেওয়া হয়েছে যা আধুনিক বিজ্ঞান কেবল গত শতাব্দীতে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। ইসলাম মানুষকে সৃষ্টিজগত নিয়ে গবেষণা করার নির্দেশ দেয়, কারণ সৃষ্টির গভীরতা বুঝলে স্রষ্টার মহিমা বোঝা সহজ হয়।
একজন মুমিনের কাছে সময় অত্যন্ত মূল্যবান। ইসলামে সময়ের অপচয়কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। দুনিয়া হলো আখেরাতের শস্যক্ষেত্র। এখানে আমরা যা বপন করব, পরকালে তাই কাটব। এই সংক্ষিপ্ত জীবনের প্রতিটি কাজের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে—এই চেতনা যার মধ্যে থাকবে, তার পক্ষে কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হওয়া সম্ভব নয়।
তাকওয়া (التقوى) আরবি শব্দ, যা ইসলামি পরিভাষায় একটি গভীর এবং ব্যাপক অর্থ বহন করে। এর সরল বাংলা অনুবাদ হলো আল্লাহভীতি, কিন্তু এর মূল অর্থ আরও বিস্তৃত। তাকওয়া হলো এমন একটি সচেতনতা, যা মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তাঁর আদেশগুলো মেনে চলতে এবং তাঁর নিষেধগুলো থেকে দূরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি হৃদয়ের এমন এক অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ব্যবস্থা, যা বান্দাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে রক্ষা করে। পবিত্র কুরআনে তাকওয়াকে মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ পাথেয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই আর্টিকেলে আমরা তাকওয়ার সঠিক সংজ্ঞা, কোরআন ও হাদিসের আলোকে এর গুরুত্ব এবং আমাদের ব্যবহারিক জীবনে তাকওয়া অর্জন করার উপায়গুলো আলোচনা করব।
আভিধানিক অর্থ:
তাকওয়া শব্দটি এসেছে 'ওকায়া' (وقاية) মূল থেকে, যার অর্থ হলো রক্ষা করা, বাঁচানো বা নিরাপত্তা দেওয়া। অর্থাৎ, বান্দা নিজেকে আল্লাহর শাস্তি ও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করছে।
পারিভাষিক অর্থ:
ইসলামি পরিভাষায়, তাকওয়া হলো:
যার মধ্যে তাকওয়া আছে, তাকে বলা হয় মুত্তাকী (المتقي)। মুত্তাকীরাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত।
কুরআন ও হাদিসে তাকওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি ইসলামি জীবন পদ্ধতির মূল ভিত্তি।
ক. আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড:
আল্লাহ তা'আলা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তাকওয়াই হলো তাঁর কাছে মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি, বংশ বা সম্পদ নয়।
আল্লাহ বলেন: "
" (এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; এটি মুত্তাকীদের জন্য পথপ্রদর্শক – সূরা বাকারা, ২:২)।
গ. বিপদ থেকে মুক্তি ও রিযিকের উৎস:
তাকওয়া মানুষের পার্থিব ও অপার্থিব উভয় জীবনের কঠিন সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি।
আল্লাহ বলেন: "যে আল্লাহকে ভয় করে (তাকওয়া অবলম্বন করে), আল্লাহ তার জন্য (বিপদ থেকে) নিষ্কৃতির পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা তালাক, ৬৫:২-৩)। এই আয়াতটি তাকওয়ার বাস্তব উপকারিতা তুলে ধরে।
ঘ. আমল কবুলের পূর্বশর্ত:
নবী-রাসূলগণের (আ.) জীবনের শিক্ষায় দেখা যায়, কেবল মুত্তাকীদের আমলই কবুল হয়। আল্লাহ শুধুমাত্র তাকওয়াবানদের আমল গ্রহণ করেন।
তাকওয়া একটি মানসিক অবস্থা হলেও এটি অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
তাকওয়া বান্দাকে দুনিয়া ও আখেরাতে অসংখ্য কল্যাণ এনে দেয়:
তাকওয়া শুধু আনুষ্ঠানিক কিছু ইবাদতের নাম নয়, বরং এটি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের নাম—যখন আমরা কথা বলি, ব্যবসা করি, পথ চলি বা একা থাকি। এটি হৃদয়ের গভীরে প্রতিষ্ঠিত এক ঐশী প্রহরীর মতো, যা মুমিনকে সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেয়। সত্যিকারের সফলতা, শান্তি এবং মুক্তি নির্ভর করে এই আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জনের ওপর। আমাদের সকলের উচিত, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই মহামূল্যবান পাথেয়কে আঁকড়ে ধরে রাখা, যাতে আমরা দুনিয়ার বিপদ ও আখেরাতের শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়ে আল্লাহর প্রিয় মুত্তাকী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।
শীতকাল (Winter) আরামদায়ক হলেও, এই সময়ে ঠাণ্ডার কারণে ইবাদত-বন্দেগি পালনে কিছুটা অলসতা বা অসাবধানতা দেখা দিতে পারে। বিশেষত, অজু (Wudu) এবং গোসল (Ghusl) হলো ইসলামের এমন দুটি মৌলিক পবিত্রতা অর্জনের প্রক্রিয়া, যা ছাড়া নামাজ বা অন্যান্য ইবাদত শুদ্ধ হয় না। তাই তীব্র শীতেও যেন এই কাজগুলো সঠিকভাবে এবং শরিয়তসম্মতভাবে পালন করা যায়, সেই বিষয়ে মুসলিমদের অত্যন্ত সচেতন থাকা প্রয়োজন।
এই বিস্তারিত আর্টিকেলে (Article) শীতকালে অজু ও গোসলের ইসলামি বিধি-বিধান (Islamic Masail), এর ফজিলত এবং স্বাস্থ্যগত সতর্কতা নিয়ে SEO অপটিমাইজড আলোচনা করা হলো।
ইসলামে ঠাণ্ডার কষ্ট সহ্য করেও পবিত্রতা অর্জনের জন্য বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। হাদিস শরিফে এই আমলকে গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে:
সাহাবি আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমি কি তোমাদেরকে এমন কিছু শিখিয়ে দেবো না, যার মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন?” সাহাবিগণ বললেন, “হ্যাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ!” তিনি বললেন, “কষ্টকর মুহূর্তেও পরিপূর্ণভাবে অজু করা (কষ্ট সত্ত্বেও অজুর অঙ্গগুলো ভালোভাবে ধৌত করা)...।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫১)
এই হাদিস প্রমাণ করে যে, শীতের কষ্ট হলেও অজু ও গোসলের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ত্রুটি করা যাবে না। প্রতিটি অঙ্গ যেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ধৌত করা হয়, সেই বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে।
শীতকালে অজু করার সময় অসাবধানতাবশত ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ বিধি ও সতর্কতা তুলে ধরা হলো:
অজুর ফরজ হলো মুখমণ্ডল, কনুইসহ হাত ও টাখনুসহ পা ধোয়া। ঠাণ্ডার কারণে অনেকে দ্রুত পানি ব্যবহার করতে গিয়ে কোনো কোনো অঙ্গ শুকনো রেখে দেন। এটি অজু শুদ্ধ হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) কিছু মানুষকে অজুতে পায়ের গোড়ালি শুকনো রাখতে দেখে উচ্চস্বরে বলেছিলেন, "সর্বনাশ! গোড়ালির নিম্নাংশগুলোর জন্য জাহান্নামের আগুন রয়েছে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৬৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪১)
সতর্কতা:
শীতকালে মোজা পরে থাকলে অজু করার সুবিধার্থে 'খুফফাইনের উপর মাসাহ' করার বিধান রয়েছে।
শীতকালে ত্বকের শুষ্কতা (Skin Dryness) কমাতে অনেকে তেল বা লোশন ব্যবহার করেন।
ফরজ গোসলের ক্ষেত্রে সামান্য ত্রুটি হলেও তা ইবাদতের জন্য মারাত্মক ভুল হতে পারে। শীতকালে এই বিষয়ে আরও সতর্ক থাকা আবশ্যক।
ফরজ গোসলের মূল কথা হলো—শরীরের সব অংশে পানি পৌঁছানো। শীতকালে ঠাণ্ডার ভয়ে দ্রুত গোসল সারতে গিয়ে প্রায়শই পিঠের অংশ, কাঁধ, পায়ের ভাঁজ বা চুলের গোড়া শুকনো থেকে যায়।
শরিয়তের বিধান হলো—পানি থাকা সত্ত্বেও যদি ঠান্ডা পানি ব্যবহারের ফলে মৃত্যু বা মারাত্মক রোগ বৃদ্ধির প্রবল ও নিশ্চিত আশঙ্কা থাকে, তবে তায়াম্মুম করার অনুমতি রয়েছে।
শীতকালে অজু ও গোসলের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—পবিত্রতার পূর্ণতা নিশ্চিত করা এবং শরিয়তের কোনো ফরজ যেন ছুটে না যায়। গরম পানি ব্যবহার করা বৈধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে উত্তম। ঠাণ্ডা যতই হোক, ইবাদতের জন্য শরীরকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পবিত্র রাখতেই হবে। কষ্টের মুহূর্তেও এই আমলটি আল্লাহ তাআলার কাছে খুবই পছন্দনীয়।
শীতকালের এই বিধানগুলো মেনে চললে একদিকে যেমন স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে, তেমনি আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জন করা সম্ভব হবে।
ইন্টারনেট প্রযুক্তির বিস্তারে এখন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে শুধু কথা বলাই নয়, ভিডিও কলও করা যায়। একসময় টেলিফোনে বিয়ে হওয়ার কথা শোনা যেত, বর্তমানে মোবাইল ফোন কিংবা ভিডিও কলের মাধ্যমেও বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
কিন্তু এ ধরনের বিয়ের ক্ষেত্রে আইনগত ভিত্তি ও করণীয় নিয়ে প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা বলেন, পৃথিবীর দুই প্রান্তে অবস্থানরত বর-কনের মধ্যে টেলিফোন, মোবাইল বা ভিডিও কলে বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে বটে, তবে এ বিষয়ে কোনো সার্বজনীন বা একক প্রক্রিয়া অনুসৃত হচ্ছে না।
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী মুসলিম বিয়ের রেজিস্ট্রেশন হয়। আইন অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশনের জন্য যে শর্তগুলো পূরণ করতে হয় তা হলো—
১. বর-কনের সম্মতি থাকতে হবে (যা প্রমাণযোগ্য হতে হবে)।
২. কাজীর উপস্থিতিতে উভয় পক্ষ বা তাদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সম্মতি নিতে হবে।
৩. বিয়েতে দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতি আবশ্যক।
৪. কাবিননামায় উভয় পক্ষ বা তাদের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করবেন।
ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা জানান, টেলিফোন বা ভিডিও কলে মৌখিকভাবে সম্মতি দেওয়াই বিয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ, এসব মাধ্যমে অন্য শর্ত পূরণ করা গেলেও বিদেশে বসবাসরত বর বা কনের সম্মতিসূচক স্বাক্ষর নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশে অবস্থানরত পক্ষকে আম-মোক্তারনামা বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে কাউকে দায়িত্ব দিতে হয়। সেই প্রতিনিধি বর-কনের পক্ষ থেকে কাবিননামায় স্বাক্ষর করবেন। পরবর্তীতে প্রবাসী ব্যক্তি দেশে এসে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে পারবেন।
তবে রেজিস্ট্রেশনের আগে বিদেশে থাকা অবস্থায় প্রবাসী ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ের ঘোষণা সত্যায়িত করতে হবে। পরে সেই সত্যায়িত দলিল কাবিননামার সঙ্গে জমা দিয়েই বাংলাদেশে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করা যাবে।