মানুষের জীবন এক সরলরেখায় চলে না। জীবনে সুখ যেমন আছে, দুঃখও তেমন আছে। কখনো আকাশছোঁয়া সফলতা আমাদের আনন্দ দেয়, আবার কখনো ঘোর অমানিশার মতো বিপদ আমাদের ঘিরে ধরে। যখন চাকরি চলে যায়, ব্যবসায় ধস নামে, আপনজন হারিয়ে যায় কিংবা দুরারোগ্য ব্যাধিতে শরীর ভেঙে পড়ে—তখন মানুষ হিসেবে আমরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। মনে হয়, পৃথিবীর সব আলো নিভে গেছে।
কিন্তু একজন মুমিন বা বিশ্বাসীর জন্য এই হতাশা কখনোই স্থায়ী হতে পারে না। ইসলামের দৃষ্টিতে বিপদ-আপদ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রধান দুটি হাতিয়ার হলো—সবর (ধৈর্য) এবং তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা)। আজকের আর্টিকেলে আমরা কুরআন ও হাদিসের আলোকে জানব, কীভাবে কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করতে হয় এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায়।
সবর বা ধৈর্য আসলে কী?
'সবর' একটি আরবি শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ হলো বিরত রাখা বা বাধা দেওয়া। ইসলামি পরিভাষায়, জীবনের যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে স্থির রাখা, আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং অভিযোগ না করে পরিস্থিতির মোকাবিলা করাকেই সবর বলা হয়।
অনেকে মনে করেন, হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার নাম ধৈর্য। এটি ভুল ধারণা। ইসলামে ধৈর্যের তিনটি স্তর রয়েছে:
১. ইবাদতের ক্ষেত্রে ধৈর্য: নিয়মিত নামাজ, রোজা এবং অন্যান্য ইবাদত পালনে কষ্ট স্বীকার করা।
২. পাপ থেকে বিরত থাকার ধৈর্য: নফস বা প্রবৃত্তি পাপ কাজ করতে চাইলেও আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সংবরণ করা।
৩. বিপদ-আপদে ধৈর্য: রোগ-শোক, অভাব-অনটন বা যে কোনো মুসিবতে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে শান্ত থাকা।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”
(সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩)
মানুষ কেন বিপদে পড়ে? এটি কি শাস্তি নাকি পরীক্ষা?
অনেক সময় আমরা বিপদে পড়লে ভাবি, "আল্লাহ কেন আমাকেই কষ্ট দিচ্ছেন? আমি তো কোনো ক্ষতি করিনি।" এই ভাবনাটি শয়তানের প্ররোচনা। মনে রাখতে হবে, দুনিয়াটা জান্নাত নয়; এটি একটি পরীক্ষাকেন্দ্র (Exam Hall)। এখানে পদে পদে পরীক্ষা দিতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-মুলক এর শুরুতে বলেছেন, তিনি জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন কে আমল বা কর্মে শ্রেষ্ঠ তা পরীক্ষা করার জন্য। আবার সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন:
“আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।”
সুতরাং, বিপদ আসা মানেই আল্লাহ আপনার ওপর রাগান্বিত—বিষয়টি এমন নয়। বরং নবীদের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। তাই বিপদ এলে বুঝতে হবে, আল্লাহ আপনার ঈমানের দৃঢ়তা যাচাই করছেন অথবা আপনার গুনাহ মাফ করে পরকালের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চাইছেন।
তাওয়াক্কুল: হতাশা মুক্তির মহৌষধ
ধৈর্যের পরই আসে ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর ভরসা করার বিষয়টি। তাওয়াক্কুল মানে হলো—সাধ্যমতো চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
ধরুন, আপনি অসুস্থ। এখন ডাক্তার দেখানো, ওষুধ খাওয়া এবং স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া হলো আপনার চেষ্টা। আর সুস্থ করার মালিক আল্লাহ—এই বিশ্বাস রাখা হলো তাওয়াক্কুল। চেষ্টা না করে ঘরে বসে থেকে "আল্লাহ ভরসা" বলা বোকামি, আবার শুধু চেষ্টার ওপর নির্ভর করে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া হলো অহংকার।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।”
(সূরা তালাক, আয়াত: ৩)
যখন আপনি বিশ্বাস করবেন যে, আমার জীবনের নিয়ন্ত্রণ আমার রবের হাতে এবং তিনি যা করবেন তাতেই আমার কল্যাণ নিহিত—তখন পৃথিবীর কোনো ডিপ্রেশন বা এনজাইটি আপনাকে গ্রাস করতে পারবে না।
নবীদের জীবনে ধৈর্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করা সহজ নয়, কিন্তু আমরা যদি নবীদের জীবনের দিকে তাকাই, তবে অনুপ্রেরণা পাব।
১. আইয়ুব (আ.)-এর অসুস্থতা:
হযরত আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর সম্পদ ধ্বংস হয়েছিল, সন্তানরা মারা গিয়েছিল। কিন্তু তিনি কখনো আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। তিনি শুধু বলেছিলেন, "আমাকে দুঃখ স্পর্শ করেছে, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।" আল্লাহ তাঁর ধৈর্য দেখে তাঁকে পুনরায় সুস্থতা ও দ্বিগুণ সম্পদ দান করেছিলেন।
২. ইউসুফ (আ.)-এর কারাভোগ:
ছোটবেলায় ভাইদের দ্বারা কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়া, এরপর দাস হিসেবে বিক্রি হওয়া, মিথ্যা অপবাদে বছরের পর বছর জেল খাটা—ইউসুফ (আ.)-এর জীবন ছিল ট্র্যাজেডিতে ভরা। কিন্তু তিনি সবর ও তাওয়াক্কুল ছাড়েননি। ফলাফলস্বরূপ, আল্লাহ তাঁকে মিশরের রাজক্ষমতা দান করেছিলেন।
৩. ইয়াকুব (আ.)-এর কান্না:
প্রিয় পুত্র ইউসুফকে হারিয়ে পিতা ইয়াকুব (আ.) কেঁদে কেঁদে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, "ফাসাবরুন জামিল"—অর্থাৎ, "উত্তম ধৈর্যই আমার শ্রেয়।" তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি এবং শেষ পর্যন্ত হারানো সন্তানকে ফিরে পেয়েছিলেন।
বিপদের সময় করণীয় ৫টি আমল
আপনি যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন বা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন, তখন নিচের ৫টি আমল আপনার হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দিতে পারে:
১. নামাজের প্রতি যত্নবান হোন:
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো সংকটে পড়তেন, তখনই নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। সিজদাহ হলো আল্লাহর সবচেয়ে কাছে যাওয়ার মাধ্যম। সিজদায় গিয়ে আপনার মনের সব কথা আল্লাহকে খুলে বলুন।
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা:
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না এবং তার সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেন। 'আস্তাগফিরুল্লাহ' পাঠের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৩. ইউনুস (আ.)-এর দোয়া পড়া:
বিপদ থেকে মুক্তির জন্য মাছের পেটে থাকা অবস্থায় ইউনুস (আ.) যে দোয়াটি পড়েছিলেন, তা অত্যন্ত শক্তিশালী।
দোয়াটি হলো: “লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জঅলিমিন।”
অর্থ: "আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।"
৪. সাদাকাহ বা দান করা:
দান-সাদাকাহ বিপদ-আপদ দূর করে এবং আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে। সাধ্যমতো গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করুন, এটি আপনার বিপদ মুক্তির ওসিলা হতে পারে।
৫. কুরআনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন:
কুরআন হলো অন্তরের শিফা। হতাশার সময় সূরা আদ-দুহা, সূরা আলাম-নাসরাহ (ইনশিরাহ) এবং সূরা ইউসুফ অর্থসহ পড়ুন। দেখবেন, মনের ভার অনেক হালকা হয়ে গেছে।
সবরকারীদের জন্য আল্লাহর পুরস্কার
আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যশীলদের জন্য এমন পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন, যা অন্য কোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে দেননি। সাধারণত প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ধৈর্যের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন:
“ধৈর্যশীলদের তো অপরিমিত (বিনা হিসাবে) পুরস্কার দেওয়া হবে।”
(সূরা জুমার, আয়াত: ১০)
এছাড়া, দুনিয়াতেও কষ্টের পরে স্বস্তি আসে। আল্লাহ সূরা ইনশিরাহে দুইবার করে জোর দিয়ে বলেছেন, “নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।” তাই আজকের এই রাত যত অন্ধকারই হোক না কেন, আগামীকাল ভোরের সূর্য উদিত হবেই।
উপসংহার
জীবন মানেই যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে হার-জিত থাকবে, সুখ-দুঃখ থাকবে। কিন্তু মুমিন হিসেবে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। আজকের এই কঠিন সময়টাও একসময় স্মৃতি হয়ে যাবে।
যদি আপনি এখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যান, তবে ভেঙে পড়বেন না। চোখের পানি মুছুন, ওযু করে জায়নামাজে দাঁড়ান এবং রবের ওপর ভরসা করুন। মনে রাখবেন, আল্লাহ কাউকেই তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না। আপনার ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাসই আপনাকে এই ঝড় থেকে নিরাপদে তীরে ভিড়াবে, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে কঠিন সময়ে ‘সবরে জামিল’ বা উত্তম ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Comments
Post a Comment