![]() |
| প্রতীকী ছবি |
তাওয়াক্কুল কী?
'তাওয়াক্কুল' (توكل) শব্দটি আরবি 'ওয়াকালা' ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ কাউকে দায়িত্ব অর্পণ করা বা প্রতিনিধি বানানো। ইসলামি পরিভাষায় তাওয়াক্কুল হলো— নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা-পরিশ্রম করার পর সম্পূর্ণ ফলাফল আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া এবং এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে একমাত্র তিনিই সর্বোত্তম ব্যবস্থাকারী।
বিখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন: তাওয়াক্কুলের অর্থ কর্ম ত্যাগ নয়, বরং কর্মের পাশাপাশি অন্তরকে আল্লাহর সাথে যুক্ত রাখা। যে ব্যক্তি চেষ্টা না করে শুধু তাওয়াক্কুলের দাবি করে, সে আসলে তাওয়াক্কুলকেই ভুল বুঝেছে।
কুরআনের আলোয় তাওয়াক্কুল
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বারবার তাওয়াক্কুলের নির্দেশ দিয়েছেন এবং মুতাওয়াক্কিলদের বিশেষ মর্যাদার কথা জানিয়েছেন।
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর কাজ সম্পন্ন করেন।" — (সূরা তালাক: ৩)
এই আয়াতে 'হাসবুহু' শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক— অর্থ হলো আল্লাহ একাই তার জন্য সব দিক থেকে যথেষ্ট।
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।" — (সূরা আলে-ইমরান: ১৫৯)
আল্লাহ নিজে বলছেন তিনি তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন— এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?
হাদিসের আলোয় তাওয়াক্কুল
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যদি তোমরা আল্লাহর উপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদের সেইভাবে রিজিক দিতেন যেভাবে পাখিদের রিজিক দেন— তারা ভোরে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেট ভরে ফিরে আসে।"
— তিরমিযি: ২৩৪৪
এই হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— পাখি কিন্তু বাসায় বসে থাকে না, সে উড়ে যায়, চেষ্টা করে। কিন্তু তার ভরসা থাকে শুধু আল্লাহর উপর।
"যখন তোমরা ঘর থেকে বের হও তখন বলো: 'বিসমিল্লাহ, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।' যে এটা বলে তাকে বলা হয়— তোমাকে সঠিক পথ দেখানো হলো, তোমাকে রক্ষা করা হলো।"
— আবু দাউদ: ৫০৯৫
তাওয়াক্কুল ও চেষ্টার সম্পর্ক
একবার এক সাহাবি উট না বেঁধে মসজিদে আসলেন। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, "উট কোথায়?" সাহাবি বললেন, "আল্লাহর উপর ভরসা করে ছেড়ে দিয়েছি।" রাসূল (সা.) বললেন:
"প্রথমে উট বাঁধো, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করো।" — তিরমিযি: ২৫১৭
এই একটি হাদিস সব পরিষ্কার করে দেয়— চেষ্টা + আল্লাহর উপর ভরসা = প্রকৃত তাওয়াক্কুল। চেষ্টা ছাড়া শুধু মুখে ভরসার কথা বলা আসলে অলসতার আবরণ মাত্র।
তাওয়াক্কুলের তিনটি স্তর
আলেমগণ তাওয়াক্কুলকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন:
প্রথম স্তর: বান্দা জানে যে আল্লাহই একমাত্র রব এবং তিনিই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। এই জ্ঞান অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করাই প্রথম ধাপ।
দ্বিতীয় স্তর: বিপদ এলে ধৈর্য হারায় না, বরং আল্লাহর পরিকল্পনার উপর আস্থা রাখে। এই স্তরে পৌঁছানো কঠিন, কিন্তু যে তাওয়াক্কুল শিখেছে সে জানে— "এই কষ্টও আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ।"
তৃতীয় স্তর: সুখ-দুঃখ উভয় অবস্থায় আল্লাহর প্রতি সমান সন্তুষ্ট থাকা। এই স্তর অর্জন করেছিলেন নবী-রাসূলগণ। ইব্রাহিম (আ.) আগুনে নিক্ষিপ্ত হলেও অন্তর শান্ত ছিল— কারণ তিনি জানতেন, আল্লাহ তাঁর রব।
তাওয়াক্কুলের অলৌকিক ফল
আল্লাহ কুরআনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করেনি।" — (সূরা তালাক: ২-৩)
'মিন হায়সু লা ইয়াহতাসিব'— যেখান থেকে সে ভাবতেও পারেনি। কত মানুষ বলেন— "জানি না কীভাবে হয়ে গেল, কিন্তু হয়ে গেল।" এটাই আল্লাহর গায়েবী সাহায্য।
আধুনিক জীবনে তাওয়াক্কুলের প্রয়োগ
আজকের উদ্বেগপূর্ণ দুনিয়ায় তাওয়াক্কুল একটি অপরিহার্য ওষুধ। মানসিক চাপ ও হতাশার মূল কারণ হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং নিজের উপর সীমাতিরিক্ত নির্ভরতা।
চাকরির পরীক্ষায় পুরোপুরি প্রস্তুতি নিন, তারপর ফলাফল আল্লাহর উপর ছেড়ে দিন। ব্যবসায় সৎভাবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন, মুনাফা-লোকসান আল্লাহর ইচ্ছার উপর ন্যস্ত করুন। চিকিৎসা নিন, ওষুধ খান, কিন্তু শিফা দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর— এই বিশ্বাস রাখুন। যে মানুষ এই মানসিকতা গড়ে তুলতে পারে, সে পৃথিবীর কোনো ব্যর্থতাকে চূড়ান্ত মনে করে না।
উপসংহার
তাওয়াক্কুল কোনো দুর্বলের আশ্রয় নয়— এটি সত্যিকারের শক্তিশালী মানুষের বৈশিষ্ট্য। যে মানুষ আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে শিখেছে, সে পৃথিবীর কোনো পরিস্থিতিতেই ভেঙে পড়ে না। সে জানে— ঝড় আসবে, কিন্তু আল্লাহ আছেন।
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
"আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কার্যনির্বাহী।" — (সূরা আলে-ইমরান: ১৭৩)
আল্লাহুম্মা তাওয়াক্কালতু আলাইক — আমিন।

Comments
Post a Comment