জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে গেছে আমূল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। দলটির প্রধান শেখ হাসিনা ভারতে পলাতক এবং মূল নেতৃত্ব হয় কারাগারে, নয়তো আত্মগোপনে। এই শূন্যতায় আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক নিজেদের অনুকূলে আনতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে দ্বিখণ্ডিত জাতীয় পার্টির (জাপা) দুই অংশ।
একদিকে জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন অংশ, অন্যদিকে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বে ‘হেভিওয়েট’ নেতাদের নিয়ে গঠিত নতুন জাতীয় পার্টি—উভয়েরই এখন প্রধান লক্ষ্য আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া ভোট।
আওয়ামী লীগের ভোটের হিসাব-নিকাশ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের সখ্য রয়েছে। ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন থেকে শুরু করে ২০০৮ সালের মহাজোট এবং পরবর্তী তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গী ছিল জাপা।
প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, এখনো প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে রাখার পক্ষে, যাদের বড় অংশই দলটির একনিষ্ঠ সমর্থক। যেহেতু নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নেই এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার মতো পরিস্থিতিও নেই, তাই এই ভোটের বড় দাবিদার হিসেবে নিজেদের মনে করছে জাপা। বিএনপি বা জামায়াত এই ভোট টানার চেষ্টা করলেও, পুরোনো সম্পর্কের জের ধরে জাপা এই ভোটে ভাগ বসাতে চাইছে।
‘হেভিওয়েট’ নেতাদের নিয়ে আনিসুলের এনডিএফ
জি এম কাদেরকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মুজিবুল হক চুন্নুর নেতৃত্বে গঠিত নতুন জাতীয় পার্টি বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে দলছুট এবং সাবেক অনেক মন্ত্রী-এমপি এই অংশে যোগ দিয়েছেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জেপিও এই অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
তাঁরা গঠন করেছেন ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)’, যেখানে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলে ১৮টি দল রয়েছে। জোটের পক্ষ থেকে ১১৯টি আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ জন সাবেক সংসদ সদস্য এবং ৭ জন সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। সরকার ও প্রভাবশালী মহলের একাংশের সমর্থনও এই অংশের প্রতি রয়েছে বলে গুঞ্জন আছে। এমনকি জামায়াতের বিকল্প শক্তি হিসেবে এই জোটকে দাঁড় করানোর চিন্তাভাবনাও চলছে বলে রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
জি এম কাদেরের ভরসা ‘লাঙ্গল’
অন্যদিকে, জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে পরিচিত মুখের সংকট প্রকট। সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা এবং সাবেক এমপি নূর মোহাম্মদ মণ্ডল দলে ফিরলেও আনিসুল অংশের তুলনায় তারকা নেতার সংখ্যা এখানে নগণ্য। দলটির বর্তমান মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী।
তবে জি এম কাদেরের অংশের বড় শক্তির জায়গা হলো দলীয় প্রতীক ‘লাঙ্গল’। যদিও প্রতীক কার হবে তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সুরাহা হয়নি, তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের ধারণা, আইনি লড়াইয়ে লাঙ্গল জি এম কাদেরের হাতেই থাকার সম্ভাবনা বেশি।
ভোটের মাঠে প্রভাব
জাতীয় পার্টি বরাবরই নেতানির্ভর দল। রংপুরের বাইরে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল। সাম্প্রতিক জরিপে মাত্র ০.১ শতাংশ মানুষ মনে করেন জাপা সরকার গঠন করতে পারে। তবে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, রুহুল আমিন হাওলাদার ও কাজী ফিরোজ রশীদের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক এবং আওয়ামী লীগের নীরব সমর্থনের ওপর ভর করে এনডিএফ জোট নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভোট কার বাক্সে যাবে এবং জাতীয় পার্টির কোন অংশ মূল ধারায় টিকে থাকবে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত।
সূত্র: প্রথম আলো

Comments
Post a Comment