ভারতে আবারও নৃশংস গণপিটুনির শিকার হয়ে প্রাণ হারালেন এক মুসলিম ব্যক্তি। সাইকেলে করে কাপড় বিক্রি করতে গিয়ে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম মুহাম্মদ আতাহার হুসেইন (৪০)। ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের বিহার রাজ্যের নালন্দা জেলায়।
গত ৫ ডিসেম্বর রাতে তাকে নির্মমভাবে পেটানো হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১২ ডিসেম্বর বিহার শরীফ সদর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
নাম শুনেই হামলা ও নির্মমতা
নিহতের ভাই মুহাম্মদ চাঁদ ঘটনার ভয়াবহ বিবরণ দিয়ে জানান, আতাহার গত ২০ বছর ধরে ফেরি করে কাপড় বিক্রি করতেন। ৫ ডিসেম্বর রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তার সাইকেলের চাকা পাঙচার হয়ে যায়। অন্ধকার রাস্তায় ভট্টা গ্রামের মোড়ে আগুন পোহাতে থাকা কয়েকজনের কাছে তিনি মেরামতের দোকানের খোঁজ চান।
এ সময় মদ্যপ অবস্থায় থাকা ওই ব্যক্তিরা তার নাম জানতে চায়। ‘মুহাম্মদ আতাহার হুসেইন’ নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর তাকে জোর করে সাইকেল থেকে নামিয়ে কাপড় খুলে তার ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। পরে হাত-পা বেঁধে একটি ঘরে আটকে তাকে বেধড়ক পেটানো হয় এবং টাকা-পয়সা লুট করে নেওয়া হয়। হামলাকারীরা তাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে পুলিশকে ফোন করে মিথ্যা চুরির গল্প সাজায়।
পুলিশের ভূমিকা ও ১১ জন গ্রেপ্তার
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গুরুতর আহত আতাহারকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা দায়ের করে—একটি চুরির অভিযোগে আতাহারের বিরুদ্ধে এবং অন্যটি মারধরের অভিযোগে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে। তবে নওয়াদা সদর ডেপুটি পুলিশ সুপার হুলাস কুমার স্বীকার করেছেন, তদন্তে আতাহার হুসেইনের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক কাজের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
চিকিৎসায় অবহেলা ও পরিবারের আহাজারি
নিহতের স্ত্রী শবনম পারভিন অভিযোগ করেন, হাসপাতালে তার স্বামী যন্ত্রণায় কাতরালেও পুলিশ তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য কোথাও নিতে বাধা দেয়। তিন দিন পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে পাওয়াপুরী হাসপাতালে পাঠানো হয়, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। গত ১২ ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শবনম বলেন, ‘নাম শোনার পরই ওরা আমার স্বামীকে মারতে শুরু করে। আজ আমি বিধবা হলাম, আমার সন্তানরা এতিম হলো। ওরা এখন কাকে বাবা বলে ডাকবে?’
আতঙ্কে মুসলিম গ্রামবাসী
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর ওই এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। আতাহারের ভাই জানান, ভয়ে তাদের গ্রামের কোনো মুসলিম পুরুষ এখন ফেরি করতে বা ব্যবসার কাজে গ্রামের বাইরে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছেন না।

Comments
Post a Comment