জাতীয় নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ মুহূর্তের ঠিক আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন ভাগাভাগির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) বড় ধরনের ভাঙন ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দলের ঘোষিত আদর্শ ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়ে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন দলের দুই শীর্ষ নেতা। একই সঙ্গে আদর্শিক কারণ দেখিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অন্তত ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা।
পদত্যাগের হিড়িক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জারা
শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তাসনিম জারা পদত্যাগ করেছেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করেন যুগ্ম সম্পাদক মীর আরশাদুল হক। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আরও কয়েকজন নেতা পদত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
পদত্যাগের পর তাসনিম জারা ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। ফেসবুকে এক আবেগঘন পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি আপনাদের কথা দিয়েছিলাম নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার জন্য লড়ব। পরিস্থিতি যা-ই হোক, আমি সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে বদ্ধপরিকর।’ তিনি নির্বাচনের খরচের জন্য ‘ক্রাউডফন্ডিং’-এর মাধ্যমে তোলা ৪৭ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং প্রার্থিতা বৈধ করতে ভোটারদের স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করেছেন।
৩০ নেতার চিঠি: ‘নীতি বিসর্জন দিয়ে কৌশল হতে পারে না’
জামায়াতের সঙ্গে জোট বা সমঝোতাকে তৃণমূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা উল্লেখ করে ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা আহ্বায়ককে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তাঁরা অভিযোগ করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে জামায়াত ও ছাত্রশিবির এনসিপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার, নারীদের ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং বিভাজনের রাজনীতি করেছে। এছাড়া একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা ও গণহত্যার বিষয়টি এনসিপির গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
চিঠিতে নেতারা বলেন, ‘যদি মধ্যপন্থী সমর্থকেরা সরে যান, তবে দল তার ভিত্তি হারাবে। কৌশল নির্ধারণ হতে হবে নীতির ভিত্তিতে; কৌশলগত কারণে নীতি বিসর্জন দেওয়া যায় না।’
হাদি হত্যা ও প্রেক্ষাপট পরিবর্তন
এনসিপি সূত্র জানায়, গত দুই মাস ধরে দলটি এককভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং ১২৫ জন প্রার্থীও চূড়ান্ত করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরীফ ওসমান বিন হাদীর হত্যাকাণ্ডের পর দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ে। জাতীয় রাজনীতিতে অবস্থান সুসংহত করতে তাঁরা বড় কোনো শক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের একাধিক বৈঠক হয়।
জোটের শরিকদের মধ্যে ফাটল
এনসিপির এই সিদ্ধান্তে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’-এর শরিকদের মধ্যেও ফাটল ধরেছে। এবি পার্টির মজিবুর রহমান মনজু জামায়াতের সঙ্গে জোটে রাজি থাকলেও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান হাসনাত কাইয়ুম এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি জামায়াতকে ‘অগণতান্ত্রিক ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট গঠিত হয়েছিল জামায়াত ও বিএনপির বাইরে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরির জন্য।
নেতৃত্বের ব্যাখ্যা
এদিকে বিতর্কের মুখে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এক বিবৃতিতে জানান, সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও জামায়াত ও অন্যান্য দলের সঙ্গে এনসিপির মূল বিষয়গুলোতে মিল পাওয়া গেছে। রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই এই সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে জামায়াতের এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক জোট নয়, বরং আসনভিত্তিক সমঝোতা।

Comments
Post a Comment