সর্বশেষ সংবাদ
সংবাদ লোড করা হচ্ছে...
আপনি প্রযুক্তি বিষয়ক এই লেখাটি পড়ছেন

অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট: সাময়িক সুবিধা না দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি?

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১০, ২০২৫

 


ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) চালু হওয়ার পর থেকেই দেশের মোবাইল ফোন বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। বিটিআরসি (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন)-এর এই পদক্ষেপের ফলে অবৈধ পথে আসা মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবহার বন্ধ করার প্রক্রিয়া কঠোর হয়েছে। কিন্তু দামের পার্থক্যের কারণে অনেক গ্রাহক এখনও ‘আনঅফিশিয়াল’ বা অবৈধ ফোনের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই নিবন্ধে, আমরা আলোচনা করব অবৈধ হ্যান্ডসেট কেনা উচিত কিনা, দামের তারতম্য এবং আপনার ফোনটি নিবন্ধিত কিনা, তা যাচাই করার সঠিক উপায়।

​কেন অবৈধ হ্যান্ডসেট কেনা উচিত নয়? (ঝুঁকি ও অসুবিধা)

​অবৈধ হ্যান্ডসেট সাময়িকভাবে সাশ্রয়ী মনে হলেও, এটি ব্যবহারকারী এবং দেশের অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।

​১. নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি

​NEIR সিস্টেমের প্রধান কাজ হলো বৈধ IMEI (International Mobile Equipment Identity) নম্বর ছাড়া কোনো ফোনকে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে না দেওয়া। যদি আপনি নতুন কোনো অনিবন্ধিত ফোন কেনেন, তবে যেকোনো সময় বিটিআরসি (BTRC) আপনার ফোনটিকে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। ফলস্বরূপ, আপনার দামী হ্যান্ডসেটটি একটি অকেজো ডিভাইসে পরিণত হতে পারে।

​২. নকল, ক্লোন বা রিফারবিশড পণ্য

​যেসব ফোন অবৈধ পথে দেশে আসে, সেগুলোর একটি বড় অংশ হলো নিম্নমানের নকল, ক্লোন বা বিদেশ থেকে আনা পুরনো ‘রিফারবিশড’ ফোন, যা দেখতে নতুনের মতো হলেও মান খারাপ হয়। এই ফোনগুলোর ব্যাটারি লাইফ কম থাকে বা কিছুদিন ব্যবহারের পরই দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। গ্রাহক হিসেবে আপনি প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

​৩. নিরাপত্তা ও অপরাধমূলক কার্যকলাপ

​অনেক অবৈধ হ্যান্ডসেট একই IMEI নম্বর ব্যবহার করে, যা সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ তদন্তের জন্য বড় সমস্যা সৃষ্টি করে। এই ফোনগুলি ব্যবহার করে সংঘটিত মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, সিম ক্লোনিং বা অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

​৪. দেশের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি

​মোবাইল ফোন বৈধভাবে আমদানির ক্ষেত্রে সরকারকে মোটা অঙ্কের শুল্ক (প্রায় ৬১% পর্যন্ত) দিতে হয়। অবৈধ পথে আসা ফোনগুলো শুল্ক ফাঁকি দেয়। ফলে সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এই রাজস্ব ক্ষতি দেশের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

​অবৈধ ফোনের দামের তারতম্য কেন হয়?

​অবৈধ হ্যান্ডসেটের প্রতি গ্রাহকদের আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ হলো এর কম দাম।

​দাম কম হওয়ার কারণ:

​একটি অবৈধ হ্যান্ডসেট সাধারণত অফিসিয়াল হ্যান্ডসেটের তুলনায় ১০% থেকে ৪০% পর্যন্ত কম দামে বিক্রি হতে পারে। এই দামের পার্থক্য তৈরি হয় মূলত শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার কারণে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি ফোনের আমদানি মূল্য ২০,০০০ টাকা হয় এবং বৈধ পথে এলে তার ওপর অতিরিক্ত ১২,০০০ টাকা শুল্ক দিতে হয়, তবে অবৈধ পথে আনা হলে ক্রেতাকে এই ১২,০০০ টাকা দিতে হয় না।

​তবে মনে রাখতে হবে, কম দামের এই সুবিধা নিতে গিয়ে আপনি একটি স্থায়ী ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। শুল্ক কমানোর জন্য সরকার বর্তমানে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও, যতক্ষণ না সেটি পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে, ততক্ষণ অবৈধ ফোনের লোভনীয় দাম গ্রাহকদের জন্য একটি ফাঁদ মাত্র।

​আপনার মোবাইল ফোনটি নিবন্ধিত কিনা, জানবেন কীভাবে?

​নতুন বা পুরনো, আপনার মোবাইল ফোনটি বিটিআরসি’র ডাটাবেজে নিবন্ধিত আছে কিনা, তা যাচাই করা অত্যন্ত সহজ এবং জরুরি। কেনার আগে অবশ্যই এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন:

​ধাপ ১: IMEI নম্বর সংগ্রহ করুন

  • ​আপনার ফোনের ডায়াল অপশনে গিয়ে *#06# ডায়াল করুন।
  • ​স্ক্রিনে ১৫ অঙ্কের একটি IMEI নম্বর দেখতে পাবেন। এই নম্বরটি লিখে রাখুন। (এছাড়াও ফোনের বক্স বা রসিদেও এই নম্বরটি দেওয়া থাকে)।

​ধাপ ২: এসএমএস পাঠান

  • ​আপনার যেকোনো সিম থেকে মেসেজ অপশনে যান।
  • ​টাইপ করুন KYD (বড় অক্ষরে)।
  • ​একটি স্পেস দিন এবং ১৫ অঙ্কের IMEI নম্বরটি লিখুন।
  • ​মেসেজটি ১৬০০২ নম্বরে পাঠিয়ে দিন।

​ধাপ ৩: ফিরতি মেসেজ যাচাই করুন

  • ​ফিরতি মেসেজে আপনি আপনার ফোনের বৈধতা সম্পর্কে জানতে পারবেন:
    • "ডিভাইসটির IMEI বিটিআরসি’র ডাটাবেজে পাওয়া গেছে": এর অর্থ আপনার ফোনটি বৈধ এবং নিবন্ধিত।
    • অন্য কোনো বার্তা (যেমন: "ডাটাবেজে পাওয়া যায়নি"): এর অর্থ হলো ফোনটি অবৈধ বা অনিবন্ধিত। এই ধরনের ফোন কেনা থেকে বিরত থাকুন।

​অন্যান্য উপায়:

​এছাড়াও, আপনি বিটিআরসি’র অফিশিয়াল NEIR পোর্টাল (neir.btrc.gov.bd)-এ গিয়ে অথবা মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার সেন্টারে যোগাযোগ করেও আপনার হ্যান্ডসেটের বৈধতা যাচাই করতে পারেন।

​সিদ্ধান্ত: ঝুঁকি এড়িয়ে চলুন

​সাশ্রয়ী দামের প্রলোভন সত্ত্বেও, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনার উচিত অবৈধ হ্যান্ডসেট কেনা থেকে বিরত থাকা। এতে আপনি যেমন দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবেন, তেমনি দেশের আইন ও অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতেও সহায়তা করবেন।


Comments

Post a Comment