ক্রিকেটের মাঠ থেকে রাজনীতির ময়দান, এরপর প্রধানমন্ত্রীর মসনদ—সবজায়গাতেই লড়াই করেছেন তিনি। তবে ইমরান খানের বর্তমান লড়াইটা চার দেয়ালের ভেতরে। রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারের ৮০৪ নম্বর সেলে বন্দী পাকিস্তানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। বিশ্লেষকরা বলছেন, কারাগারে থেকেও ইমরান খান হয়ে উঠেছেন দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ‘আইকন’। দমন-পীড়নের মুখেও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি, বরং তিনি পরিণত হয়েছেন প্রতিরোধের প্রতীকে।
কারাগারের অন্ধ কুঠুরি ও মৃত্যুর গুজব
আদিয়ালা জেলের যে প্রকোষ্ঠে একসময় জুলফিকার আলী ভুট্টোকে রাখা হয়েছিল, সেখানেই বর্তমানে দিন কাটছে ইমরান খানের। সম্প্রতি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে ইমরান খান মারা গেছেন। তবে খবরটি সত্য ছিল না। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাঁকে ফাঁসির আসামিদের সেলে সম্পূর্ণ একাকী রাখা হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ‘মানসিক নির্যাতন’ বলে অভিহিত করেছেন। ২০২৫ সালটি তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল; তোশাখানা ও আল-কাদির ট্রাস্ট মামলাসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
‘মুনিরবাদ’ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বর্তমান সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের কঠোর অবস্থানের কথা। বিশ্লেষকরা একে ‘মুনিরবাদ’ বা সামরিক নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। বর্তমানে শাহবাজ শরিফের সরকার ক্ষমতায় থাকলেও, মূল চাবিকাঠি সেনাবাহিনীর হাতেই বলে মনে করা হয়। ইমরান খানের দল পিটিআই-এর প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয়েছে, নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবুও সাধারণ ভোটার, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে ইমরান খান এখনো গণতন্ত্রের ‘সূর্যসন্তান’।
কেন তিনি এখনো জনপ্রিয়?
ভারতের কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের মতে, ইমরান খান একজন স্পষ্টভাষী ও চিন্তাশীল মানুষ। অক্সফোর্ডের শিক্ষা এবং ক্রিকেট জীবনের লড়াকু মানসিকতা তাঁকে হার না মানতে শিখিয়েছে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি সেনাবাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে উঠে আসা একজন নেতা। পাঞ্জাব এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ার তরুণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি মনে করেন, পিটিআই-ই তাঁদের ভবিষ্যতের একমাত্র আশা।
ইমরান কি ফুরিয়ে গেছেন?
রাজনীতির মাঠ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন হলেও ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। পাকিস্তানে অতীতেও কারাবন্দী নেতারা ফিরে এসেছেন। ইমরান খান কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি এখন একটি আন্দোলনের নাম। ৭৩ বছর বয়সেও তিনি নতি স্বীকার করেননি। তাঁর এই অদম্য মনোভাবই তাঁকে সমর্থকদের কাছে ‘গণতন্ত্রের বরপুত্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ইমরান খানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, কিন্তু মৃত নয়। সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও তিনি এখনো ২৪ কোটি মানুষের দেশটির সবচেয়ে বড় বিরোধী কণ্ঠস্বর। আদিয়ালা জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে তিনি ফের নেতৃত্বে ফিরতে পারবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

Comments
Post a Comment