ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক ‘আটক’ করার মার্কিন দাবিতে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি, ২০২৬) ভোরে চালানো এই অভিযানের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিশ্র ও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। লাতিন আমেরিকার প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে শুরু করে রাশিয়া ও ইরান পর্যন্ত এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি: ‘স্বৈরশাসক বিদায় নিয়েছে’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ে এই ‘বৃহৎ পরিসরের হামলা’ চালানো হয়েছে। তিনি জানান, অভিযানের পর মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ এক বিবৃতিতে একে ভেনেজুয়েলার জন্য ‘নতুন ভোর’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘স্বৈরশাসক চলে গেছে। অবশেষে সে এখন তার অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হবে।’
রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি নিশ্চিত করেছেন, মাদুরো এখন যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে থাকায় ভেনেজুয়েলায় আর কোনো সামরিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা নেই এবং তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হবে।
লাতিন আমেরিকায় ক্ষোভ: সীমান্তে কলম্বিয়ার সেনা
এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে প্রতিবেশী কলম্বিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এই হামলাকে ভেনেজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রতিক্রিয়ায় তিনি ভেনেজুয়েলা সীমান্তে কলম্বিয়ার সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন। পেত্রো বলেন, ‘শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা সব ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত।’
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ ও ‘অপরাধমূলক হামলা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি শুধু ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে নয়, বরং আমাদের আমেরিকার বিরুদ্ধে পরিচালিত হামলা।’
রাশিয়া ও ইরানের নিন্দা
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে। মস্কো বলেছে, ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ বাইরের কোনো ধ্বংসাত্মক সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই নির্ধারণ করা উচিত। রাশিয়া মাদুরোর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ইরানও এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ভেনেজুয়েলার জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
ইউরোপের সতর্ক প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কাজা কালাস জানিয়েছেন, ইইউ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, ‘মাদুরোর কোনো বৈধতা নেই, তবে ইইউ সব পরিস্থিতিতেই আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে।’
এছাড়া স্পেন উত্তেজনা কমিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলায় বসবাসরত প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ইতালীয় নাগরিকের নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি নজর রাখছেন।

Comments
Post a Comment