২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডির পর যখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (তৎকালীন বিডিআর) এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সুযোগে ওই বছরের জুনে সিলেট সীমান্তের প্রায় ২০০ একর জমি দখলে নিয়েছিল ভারত। স্থানীয় বাসিন্দা ও তৎকালীন প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) জোর করে এই জমি দখল করলেও ‘ঊর্ধ্বতন মহলের’ নির্দেশে তৎকালীন বিজিবি সদস্যরা প্রতিরোধ গড়েও পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালে মুজিব-ইন্দিরা স্থলসীমান্ত চুক্তির আওতায় ছিটমহল বিনিময়ের সময়ও সিলেট সীমান্তে বাংলাদেশ এক ইঞ্চি জমিও ফেরত পায়নি, বরং জরিপের নামে আরও কিছু এলাকা ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জবরদখলের আদ্যোপান্ত
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৯ সালের ১৭ জুন গোয়াইনঘাটের নলজুড়ি, তামাবিল, সংগ্রাম, লামাপুঞ্জি, প্রতাপপুর, সোনারহাট, বিছানাকান্দির লক্ষণছড়া এবং জৈন্তাপুরের নলজুড়ি ও আগুছড়া এলাকার প্রায় ২০০ একর জমি বিএসএফ দখলে নেয়। এর মধ্যে পদুয়া-প্রতাপপুরে ৭০ একর, ডিবির হাওরে ৮০ একর, খাসিয়া হাওর-নলজুড়িতে ৩০ একর এবং কুলুমছড়া ও অন্যান্য এলাকায় ২০ একর জমি বেহাত হয়।
স্থানীয়দের দাবি, তৎকালীন সরকারের ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি’র কারণে চোখের সামনে দেশের মাটি বেহাত হতে দেখেও বিজিবি সদস্যদের পিছু হটতে হয়েছিল। দিলোয়ার হোসেন নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ২০০৯ সালে ডিবির হাওর শাপলা বিলে গোলাগুলির সময় বিজিবির তৎকালীন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লে. কর্নেল জহুরুল ও টুআইসি মেজর মামুন দেশের মাটি রক্ষায় অনড় ছিলেন। কিন্তু ‘ওপরের নির্দেশে’ তাঁরা কাঁদতে কাঁদতে জওয়ানদের নিয়ে পিছু হটেন। পরে এই দুই কর্মকর্তাকে বদলি ও ওএসডি করা হয়।
ছিটমহল বিনিময়ের নামে প্রতারণা?
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময় চুক্তির সময় একপাক্ষিকভাবে জরিপ চালিয়ে ভারতের অনুকূলে সীমানা নির্ধারণ করা হয়। তামাবিল শুল্ক বন্দরের নোম্যান্স ল্যান্ড সংকুচিত করে ভারত মাত্র ১৫-২০ গজ দূরে চলে এসেছে। এছাড়া জনপ্রিয় ‘ভাইরাল খেলার মাঠ’ খ্যাত নলজুড়ি বিলের ৬-৭ একর জমিও ভারত নিজেদের দাবি করে দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছে।
জৈন্তাপুরের বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন, ‘ছিটমহল চুক্তির সময় অনেক জায়গা ভারত তাদের অংশে নিয়ে গেছে। আমরা এক ইঞ্চিও পাইনি। পদুয়া মূল বিলের ৫০০ বিঘার ওপর এবং তামাবিল সংলগ্ন ১০০ বিঘার টিলা এখন ভারতের দখলে।’
সীমান্তে ক্ষোভ ও বর্তমান পরিস্থিতি
বিডিআর বিদ্রোহ এবং পরবর্তী সময়ে বিজিবির নাম পরিবর্তনের মধ্যবর্তী অস্থির সময়ে ভারত এই আগ্রাসন চালায় বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা। ২০০১ সালে পদুয়া ও বড়াইবাড়ি সীমান্তে বিডিআরের কাছে বিএসএফের পরাজয়ের প্রতিশোধ হিসেবেই ভারত এই সুযোগ কাজে লাগায় বলে মনে করেন অনেকে।
বর্তমানেও সীমান্তে বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিকদের দ্বারা ভূমি জবরদখলের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান, সীমান্ত বিষয়টি কূটনৈতিক ও স্পর্শকাতর হওয়ায় সব তথ্য বিজিবির পর্যবেক্ষণে রয়েছে এবং প্রশাসনও এ বিষয়ে অবগত আছে।

Comments
Post a Comment