অবশেষে জমা পড়ল গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিগত সরকারের আমলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য। এতে বলা হয়েছে, গুমের শিকার হয়ে যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। আর ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
রোববার (৪ জানুয়ারি, ২০২৬) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ অন্য সদস্যরা।
গুমের পরিসংখ্যান ও রাজনৈতিক পরিচয়
কমিশন জানায়, তাদের কাছে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘গুম’ হিসেবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনা ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে:
- এখনো নিখোঁজ: এদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
- জীবিত ফিরেছেন: গুম হওয়ার পর যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবির এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।
কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, অনেকেই এখনো ভয়ের কারণে বা বিদেশে অবস্থানের কারণে অভিযোগ করেননি। প্রকৃত গুমের সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাসিনা ও তারিক সিদ্দিকের সরাসরি নির্দেশ
কমিশনের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
কমিশন জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেকগুলো গুমের ক্ষেত্রে ‘সরাসরি নির্দেশদাতা’ ছিলেন। এমনকি আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে ভারতে ‘রেন্ডিশন’ বা হস্তান্তরের প্রমাণও পাওয়া গেছে, যা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছাড়া সম্ভব নয়। ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আমান আযমী ও মীর আহমদ বিন কাসেমের মতো হাই প্রোফাইল ব্যক্তিদের গুমের বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বরিশালের বলেশ্বর নদী ‘ডেথ জোন’
তদন্তে লোমহর্ষক তথ্য উঠে এসেছে লাশ গুমের স্থান সম্পর্কে। কমিশন জানায়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ক্ষেত্রে বরিশালের বলেশ্বর নদীকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে এই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুম করার প্রমাণ মিলেছে।
‘পৈশাচিক আচরণ’: প্রধান উপদেষ্টা
প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একে ‘ঐতিহাসিক কাজ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা হয়েছে, এই রিপোর্ট তার দলিল। মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত বীভৎস হতে পারে—এটি তার প্রমাণ।’
প্রধান উপদেষ্টা আয়নাঘরের পাশাপাশি যেসব জায়গায় (যেমন বলেশ্বর নদী) লাশ গুম করা হয়েছে, সেগুলোর ‘ম্যাপিং’ করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, জাতি হিসেবে এই ধরনের নৃশংসতা থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে এবং এর প্রতিকারের পথ খুঁজতে হবে।

Comments
Post a Comment