আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এবারের নির্বাচন কেবল সংসদ সদস্য নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ‘গণভোট’। জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কারের বিষয়গুলোতে জনগণের রায় জানতেই এই আয়োজন। যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়, তবে বাংলাদেশের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা ও সংবিধানে আসবে নজিরবিহীন পরিবর্তন।
গণভোটের ব্যালট ও প্রশ্নসমূহ
২০২৫ সালের ‘গণভোট অধ্যাদেশ’ অনুযায়ী, ভোটারদের ব্যালটে চারটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-তে দিতে হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন, এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্দিষ্টকরণসহ ৩০টি মৌলিক বিষয়ে সংস্কারের বাধ্যবাধকতা।
‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে যেভাবে হবে সংবিধান সংস্কার
জুলাই সনদের ৮ ধারা অনুযায়ী, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোট দিলে:
- সংবিধান সংস্কার পরিষদ: নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সাথে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
- ২৭০ দিনের সময়সীমা: সংসদ শুরুর ২৭০ দিনের মধ্যে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন সম্পন্ন করতে হবে।
- স্বয়ংক্রিয় পাস: যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিষদ কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হয়েছে বলে গণ্য হবে।
জুলাই সনদে প্রস্তাবিত উল্লেখযোগ্য ৪৮টি সংস্কার
এই সনদে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রধান পরিবর্তনগুলো হলো:
১. ক্ষমতার ভারসাম্য ও মেয়াদে পরিবর্তন:
- একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
- প্রধানমন্ত্রী একই সাথে দলীয় প্রধান ও সরকার প্রধান থাকতে পারবেন না।
- রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের ভোটে।
২. দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও আসন:
- জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট (উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ)। দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
- নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০-তে উন্নীত করা হবে।
- ৭০ অনুচ্ছেদের শিথিলতা: বাজেট ও অনাস্থা প্রস্তাব বাদে অন্য ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
৩. বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থা:
- নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তন করা হবে।
- বিচারক নিয়োগের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল শক্তিশালী করা হবে এবং ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করা হবে।
- নির্বাচন কমিশন, দুদক, পিএসসি এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠন করা হবে।
৪. জাতীয় পরিচয় ও মূলনীতি:
- নাগরিক পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’, বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে মূলনীতি হবে—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় সম্প্রীতি।
- সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বাংলার পাশাপাশি অন্য মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হলে একক ক্ষমতার প্রভাব কমবে এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হওয়ার পথ সুগম হবে। তবে আংশিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গণভোট আয়োজন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক ও উদ্বেগ রয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করে দেবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কোন পথে পরিচালিত হবে।

Comments
Post a Comment