বিশ্বজুড়ে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সংকটের জেরে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তেল বিক্রিতে 'রেশনিং' পদ্ধতি চালু করায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৈরি হচ্ছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। এর ফলে গণপরিবহনের শিডিউল বিপর্যয়সহ আসন্ন ঈদযাত্রায় নজিরবিহীন জনভোগান্তির আশঙ্কা করছেন পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্টরা।
সংকটের মুখে গণপরিবহন
পরিবহন মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, জ্বালানি স্বল্পতার কারণে অনেক বাস এরই মধ্যে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। নীলাচল পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফতাবউদ্দিন মাসুদ জানান, তাদের ৩৫০টি বাসের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ৩০টি বাস তেল সংকটে বন্ধ ছিল। বিশেষ করে দূরপাল্লার রুটে ভোগান্তি চরমে। আগে বাসের ট্যাঙ্কে একবারে ৪০০ লিটার ডিজেল ভরা যেতো, কিন্তু এখন ১০০ লিটারের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না।
আফতাবউদ্দিন মাসুদ বলেন, "এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ঈদযাত্রায় ভোগান্তি নিশ্চিত। পথে তেল নিতে বাড়তি ২-৩ ঘণ্টা সময় নষ্ট হওয়ায় বাসের শিডিউল এলোমেলো হচ্ছে। ঈদে গাড়ির চাপ বাড়লে এই দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।"
একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন আগমনী পরিবহনের মালিক মোস্তফা আজাদ চৌধুরী। তিনি জানান, ঈদের সময় বাসের ট্রিপ সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হলে তা সম্ভব হবে না।
রেশনিং ও কৃচ্ছ্রতা সাধনের প্রভাব
ইরানে সাম্প্রতিক অস্থিরতার জেরে বিশ্ববাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী:
- মোটরসাইকেল: দৈনিক সর্বোচ্চ ২ লিটার।
- ব্যক্তিগত গাড়ি: ১০ লিটার।
- দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক: ২০০ থেকে ২২০ লিটার।
- লোকাল বাস ও পিকআপ: ৭০ থেকে ৮০ লিটার।
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, "তেল পাওয়া যাবে না—এমন আতঙ্কে ছোট যানবাহনগুলো পাম্পে ভিড় করছে। তেলের সংকটের চেয়ে এই দীর্ঘ লাইনই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ঘাটতি
পাম্প মালিকদের অভিযোগ, সরকারি সিদ্ধান্তে সরবরাহ ২৫ শতাংশ কমানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তা প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে গেছে। মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেক পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ভবিষ্যতে দাম বাড়বে বা সংকট হবে—এমন গুজবে মানুষ তেল মজুত করায় গত বছরের তুলনায় ডিজেলের বিক্রি প্রায় ৪৭ শতাংশ এবং পেট্রোল-অকটেনের বিক্রি ১২ থেকে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মহাসড়কের চিত্র ও মালিকদের লোকসান
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাসড়কের নির্ধারিত ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল না পেয়ে চালকরা অন্য পাম্পে ভিড় করছেন। এতে যাত্রাপথে সময় নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া নির্ধারিত পাম্পের বাইরে থেকে তেল কেনায় তেলের সঠিক হিসাব না পাওয়ায় মালিকরা চুরির ভয়ে আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন।
সরকারের আশ্বাস
সার্বিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। শুক্রবার কমলাপুর স্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, "তেলের দাম বাড়বে না এবং আগামী রোববার (১৫ মার্চ) থেকে তেলের জোগান বাড়বে। গণপরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি অবাধে পাওয়া যাবে।" রেশনিং ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি আরও জানান, সরকার নিজস্ব সক্ষমতা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে।

Comments
Post a Comment