গত চার সপ্তাহ ধরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত অচল হয়ে আছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে এর ফলে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার সরবরাহ করা হয়, যা এখন ইরানি হুমকির মুখে স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইরানের সুবিধাজনক অবস্থান ও কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক উপস্থিতি সত্ত্বেও ইরান দুটি কারণে এই অঞ্চলে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে:
১. অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশল: ইরান সস্তা ড্রোন, সামুদ্রিক মাইন এবং দ্রুতগামী ছোট নৌকার মাধ্যমে আক্রমণ শানাতে সক্ষম।
২. ভৌগোলিক কাঠামো: হরমুজ প্রণালী এর সবচেয়ে সংকীর্ণ পয়েন্টে মাত্র ২৪ মাইল চড়া। জাহাজ চলাচলের লেনগুলো আরও সরু। ফলে এখানে বড় নৌযানের পক্ষে কৌশল পরিবর্তন বা সরে যাওয়ার জায়গা নেই। একে কার্যত একটি ‘কিল জোন’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের মতে, ইরানের প্রায় ১০০০ মাইল দীর্ঘ উপকূলরেখা পাহাড়, পর্বত ও উপত্যকায় ঘেরা। এই প্রাকৃতিক গঠন তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি ও ড্রোন ব্যবস্থা লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, সমতল উপকূল না হওয়ায় শত্রুপক্ষের জন্য আগত হুমকি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
টোল আদায় ও অর্থনৈতিক প্রভাব
হরমুজ প্রণালীর ওপর এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ইরানের জন্য লাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান নিরাপদ যাতায়াতের বিনিময়ে কিছু ট্যাংকার থেকে মোটা অঙ্কের ‘ফি’ আদায় করছে। অন্তত ১৬টি জাহাজ এই সমন্বয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পার হতে পেরেছে বলে জানা গেছে, যার মধ্যে একটি জাহাজ ২০ লাখ ডলার প্রদান করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন তৎপরতা ও বর্তমান সংকট
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধ কাটাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার অতিরিক্ত সেনা ও শক্তিশালী রণতরী (যেমন: ইউএসএস ত্রিপোলি) মোতায়েন করছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রথাগত নৌ-সক্ষমতা ধ্বংস করার দাবি করছে, তবে ছোট ‘মিজেট সাবমেরিন’ এবং মাছ ধরার নৌকা থেকে মাইন পাতার মতো অপ্রচলিত হুমকি মোকাবিলা করা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ২,০০০ জাহাজ পারস্য উপসাগরের অভ্যন্তরে আটকা পড়ে আছে। ট্রাম্প প্রশাসন হুমকি দিয়েছে যে, ইরান যদি এই পথ উন্মুক্ত না করে, তবে তাদের প্রধান তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হতে পারে। ইতিমধ্যে খার্গ দ্বীপের সামরিক স্থাপনায় মার্কিন বাহিনী আঘাত হেনেছে।

Comments
Post a Comment