৫০ বছরের বেশি সময় পর মানুষকে চাঁদের কাছে নিয়ে যাওয়ার ঐতিহাসিক মিশন শেষে পৃথিবীতে ফিরে আসছে নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী। আজ, শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাতেই প্রশান্ত মহাসাগরে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো উপকূলে স্প্ল্যাশডাউনের মধ্য দিয়ে শেষ হতে চলেছে এই অসাধারণ অভিযান।
মিশনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত
গত ১ এপ্রিল ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে নাসার স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেটে চড়ে চারজন নভোচারী মহাকাশের উদ্দেশে রওনা দেন। (esa) এই দলে ছিলেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার এবং মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোক — তিনজনই নাসার নভোচারী — এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির (সিএসএ) নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। (NASA)
প্রায় ১০ দিনের এই যাত্রায় মহাকাশযানটি মোট ৬,৯৫,০৮১ মাইল পথ পাড়ি দেবে। লঞ্চ থেকে শুরু করে স্প্ল্যাশডাউন পর্যন্ত এটিই ছিল পরিকল্পনা। (NASA)
ইতিহাস গড়া দূরত্বের রেকর্ড
আর্টেমিস-২ মিশনের ক্রু পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২,৫২,৭৫৬ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে মানব মহাকাশচারণের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছেন — ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো-১৩ মিশনের ২,৪৮,৬৫৫ মাইলের রেকর্ড ভেঙে, ৪,১১১ মাইল বেশি দূরে পৌঁছেছেন তারা। (NASA)
চাঁদের পাশ দিয়ে ঐতিহাসিক উড্ডয়ন
৬ এপ্রিল চাঁদের নিকটতম বিন্দুতে পৌঁছানোর সময় ওরিয়ন মহাকাশযানটি চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৪,০৬৭ মাইল উপরে ছিল। সেই মুহূর্তে মহাকাশযানটি পৃথিবীর সাপেক্ষে ঘণ্টায় প্রায় ৬০,৮৬৩ মাইল বেগে ছুটছিল। (NASA)
চাঁদের পেছনে যাওয়ার সময় প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য পৃথিবীর সঙ্গে সব রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মহাকাশযানটি চাঁদের পেছন থেকে বেরিয়ে আসতেই নভোচারীরা দেখতে পান 'আর্থরাইজ' — পৃথিবীকে চাঁদের দিগন্তে উঠতে দেখার সেই দুর্লভ মুহূর্ত। (NASA)
এই মিশনে নভোচারীরা সূর্যগ্রহণও পর্যবেক্ষণ করেন, যেখানে চাঁদ সম্পূর্ণভাবে সূর্যকে ঢেকে দেয় এবং সৌরমুকুট (করোনা) দৃশ্যমান হয়। প্রায় ৫৪ মিনিট স্থায়ী এই সম্পূর্ণতা পৃথিবী থেকে দেখার চেয়ে অনেক বেশিক্ষণ ছিল। (NASA)
পৃথিবীতে ফেরার যাত্রা
৭ এপ্রিল রাত ৮টা ৩ মিনিটে (ইডিটি) ওরিয়ন মহাকাশযানটি মাত্র ১৫ সেকেন্ডের জন্য থ্রাস্টার জ্বালিয়ে প্রথম রিটার্ন কারেকশন বার্ন সম্পন্ন করে, যা মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর দিকে সঠিক পথে নিয়ে আসে। (NASA)
৬ এপ্রিল চাঁদের দূরবর্তী পাশ ঘুরে আসার পর, ৭ এপ্রিল ওরিয়ন চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবমুক্ত হয়ে পৃথিবীর দিকে ফিরতি পথ শুরু করে। (NASA)
৯ এপ্রিল, মহাকাশে তাদের শেষ পূর্ণ দিনে, ক্রু পৃথিবী থেকে ১,৪৭,৩৩৭ মাইল দূরে থেকে দিন শুরু করেন। (NASA)
আজ রাতের স্প্ল্যাশডাউন — কীভাবে হবে অবতরণ?
পুনঃপ্রবেশের সময় সার্ভিস মডিউল বিচ্ছিন্ন হবে রাত ৭টা ৩৩ মিনিটে, স্প্ল্যাশডাউনের প্রায় ২০ মিনিট আগে। মহাকাশযানটি হাওয়াইয়ের দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে উপরের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে। (NASA)
প্রায় ৪,০০,০০০ ফুট উচ্চতায় নেমে আসার সময় রাত ৭টা ৫৩ মিনিটে প্রায় ৬ মিনিটের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা দেখা দেবে, কারণ তীব্র তাপে প্লাজমা ক্যাপসুলকে ঘিরে ধরবে। নভোচারীরা সেসময় সর্বোচ্চ ৩.৯ গুণ মাধ্যাকর্ষণ টান অনুভব করবেন। (NASA)
যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের পর রাত ৮টা ৩ মিনিটে প্রায় ২২,০০০ ফুটে ড্রোগ প্যারাশুট এবং ৮টা ৪ মিনিটে ৬,০০০ ফুটে তিনটি প্রধান প্যারাশুট খুলবে। এরপরই সান দিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে স্প্ল্যাশডাউন হবে রাত ৮টা ৭ মিনিটে (ইডিটি), অর্থাৎ স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৭ মিনিটে। (NASA)
উদ্ধার অভিযান
ইউএসএস জন পি. মার্থা যুদ্ধজাহাজ ইতোমধ্যে বন্দর ছেড়ে স্প্ল্যাশডাউন পয়েন্টের দিকে রওনা দিয়েছে। (NASA) স্প্ল্যাশডাউনের দুই ঘণ্টার মধ্যে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নভোচারীদের ওরিয়ন থেকে বের করে জাহাজে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে মেডিকেল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাদের নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে, হিউস্টনে, পাঠানো হবে। (NASA)
সরাসরি দেখবেন কোথায়?
আজ রাত ৬টা ৩০ মিনিট (ইডিটি) থেকে NASA+, Amazon Prime, Apple TV, Netflix, HBO Max, Discovery+, Peacock এবং Roku-তে সরাসরি সম্প্রচার শুরু হবে। (NASA)
কেন এই মিশন এত গুরুত্বপূর্ণ?
আর্টেমিস-২ শুধু একটি মহাকাশ অভিযান নয় — এটি মানবজাতির চাঁদে ফেরার দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ। এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল গভীর মহাকাশ পরিবেশে ওরিয়ন মহাকাশযানের সিস্টেম, পদ্ধতি এবং কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করা। (NASA) ভবিষ্যতে আর্টেমিস-৩ মিশনে নভোচারীরা সত্যিকার অর্থে চাঁদের মাটিতে পা রাখবেন — তার পথ এই মিশনেই প্রশস্ত হলো।

Comments
Post a Comment