সর্বশেষ সংবাদ
সংবাদ লোড করা হচ্ছে...
আপনি আন্তর্জাতিক বিষয়ক এই লেখাটি পড়ছেন

২০২৬ সালে ইন্ডিয়ান ভিসা চালু না বন্ধ? — সর্বশেষ আপডেট ও সম্পূর্ণ গাইড

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২৬

প্রতীকী ছবি 
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভিসা পরিষেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় ছিলেন লাখো বাংলাদেশি নাগরিক। চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে ভারতে যেতে ইচ্ছুকরা বারবার প্রশ্ন করছিলেন — ইন্ডিয়ান ভিসা কবে চালু হবে ২০২৬? এই আর্টিকেলে সেই প্রশ্নের সর্বশেষ এবং পূর্ণাঙ্গ উত্তর দেওয়া হয়েছে।

ভিসা বন্ধ হয়েছিল কেন? — পটভূমি

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। ২০২৪ সালের ৮ই আগস্ট প্রথমবার ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম আংশিকভাবে স্থগিত করা হয়।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরে। ঢাকার ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার (IVAC) বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ধাপে ধাপে সারাদেশে ভিসা পরিষেবা স্থগিত করা হয়। ২১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভের পর চট্টগ্রামের IVAC-ও বন্ধ হয়ে যায়। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে দিল্লি ও আগরতলায় বাংলাদেশ মিশনও ভিসা ও কনস্যুলার সেবা স্থগিত রাখে।

২০২৬ সালে পরিস্থিতির উন্নতি — টাইমলাইন

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — নতুন সরকার, নতুন সম্পর্ক

২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশে নির্বাচন সম্পন্ন হয় এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই দুই দেশের সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়।

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র তিন দিনের মাথায় নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালু করে। প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর দিল্লি, কলকাতা, শিলিগুড়ি, গুয়াহাটি ও মুম্বাইয়ের মিশনগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়।

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ভারতও বাংলাদেশিদের জন্য মেডিকেল, স্টুডেন্ট ও ডাবল-এন্ট্রি ভিসা চালু করে। একইসঙ্গে ঘোষণা করা হয় পর্যটন ভিসাসহ অন্যান্য ক্যাটাগরিও শীঘ্রই চালু হবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং উভয় পক্ষই ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সম্মত।

এপ্রিল ২০২৬ — সর্বশেষ ও সবচেয়ে বড় আপডেট

১৩ এপ্রিল ২০২৬ (সোমবার): পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ভারত সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানান যে বাংলাদেশিদের জন্য চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসা আগামী সপ্তাহ থেকে চালু করতে ভারত সম্মত হয়েছে।

তিনি বলেন — "মেডিকেল, বিজনেস ভিসা দ্রুত চালু করার কথা বলা হয়েছে ভারতের সঙ্গে। হয়তো আগামী সপ্তাহে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে।"

এর মানে হলো, এপ্রিলের তৃতীয় বা চতুর্থ সপ্তাহ থেকে (অর্থাৎ ২০–২৬ এপ্রিল ২০২৬-এর মধ্যে) পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

আরো পড়ুন- ভারতীয় ভিসার সর্বশেষ আপডেট

বর্তমানে কোন ভিসাগুলো চালু আছে?

এই মুহূর্তে (এপ্রিল ২০২৬) বাংলাদেশিদের জন্য সীমিত পরিসরে নিচের ভিসাগুলো পাওয়া যাচ্ছে:

ভিসার ধরন

বর্তমান অবস্থা

মেডিকেল (জরুরি) ভিসা

✅ চালু (সীমিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট)

স্টুডেন্ট ভিসা

✅ সীমিত পরিসরে চালু

ডাবল-এন্ট্রি ভিসা

✅ চালু

ব্যবসায়িক (বিজনেস) ভিসা

🔜 আগামী সপ্তাহে চালু হচ্ছে

মেডিকেল ভিসা (পূর্ণাঙ্গ)

🔜 আগামী সপ্তাহে চালু হচ্ছে

ট্যুরিস্ট ভিসা

⏳ শীঘ্রই আসছে

ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনার IVAC কেন্দ্রগুলোতে সীমিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট খোলা আছে।

ভারতীয় ভিসার প্রকারভেদ ও ব্যবহার

১. মেডিকেল ভিসা

চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে এই ভিসা প্রয়োজন। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন ভিসা এটি। জরুরি ক্ষেত্রে মাত্র ৭২ ঘণ্টায় পাওয়া সম্ভব। সাধারণত ৩ থেকে ৭ কার্যদিবস সময় লাগে।

২. ট্যুরিস্ট ভিসা

ভ্রমণ, পরিবার পরিদর্শন ও ধর্মীয় সফরের জন্য। সাধারণত ৭ থেকে ১৫ দিনে পাওয়া যায়। ট্যুরিস্ট ভিসায় ভারতে কোনো আয়মূলক কার্যক্রম করা যায় না।

৩. বিজনেস ভিসা

বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ভারতে যেতে এই ভিসা দরকার।

৪. স্টুডেন্ট ভিসা

ভারতের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার জন্য।

৫. এন্ট্রি ভিসা

ভারতীয় পত্নী বা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে দেখা করতে।

ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

সাধারণ (সব ভিসায় লাগে):

বৈধ পাসপোর্ট (কমপক্ষে ৬ মাসের মেয়াদ থাকতে হবে)

সদ্য তোলা ২"×২" সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের রঙিন ছবি

জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধন (১৮ বছরের নিচে)

বিগত ৩ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট (সর্বনিম্ন ১৫০ ডলার সমপরিমাণ ব্যালেন্স)

বিদ্যুৎ/গ্যাস/পানি বিলের ফটোকপি (বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ)

অনলাইনে পূরণ করা ভিসা আবেদন ফরমের স্বাক্ষরিত প্রিন্ট কপি

মেডিকেল ভিসার জন্য অতিরিক্ত:

বাংলাদেশের চিকিৎসকের রেফারেল লেটার

ভারতীয় হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার

রোগীর পূর্ববর্তী মেডিকেল রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপশন

সঙ্গে আসা আত্মীয়ের জন্য মেডিকেল অ্যাটেন্ডেন্ট ভিসার আবেদন

বিজনেস ভিসার জন্য অতিরিক্ত:

বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার নাম, ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর

ট্রেড লাইসেন্স বা NOC কার্ডের ফটোকপি

ভারতীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)

ভিসার খরচ ও প্রসেসিং সময়

বিষয়

বিবরণ

আবেদন ফি (IVAC সার্ভিস চার্জ)

প্রায় ৮০০–৯০০ টাকা

নিজে আবেদন করলে মোট খরচ

১,৩০০–১,৫০০ টাকা

এজেন্সির মাধ্যমে করলে

২,০০০–১০,০০০ টাকা পর্যন্ত

মেডিকেল ভিসা ফি (ভারতীয় মুদ্রায়)

প্রায় ₹৩,৮০০ (রোগী)

মেডিকেল অ্যাটেন্ডেন্ট ভিসা ফি

প্রায় ₹২,৯০০

মেডিকেল ভিসা প্রসেসিং সময়

৩–৭ কার্যদিবস (জরুরি ক্ষেত্রে ৭২ ঘণ্টা)

ট্যুরিস্ট ভিসা প্রসেসিং সময়

৭–১৫ কার্যদিবস

বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (IVAC)

বর্তমানে সচল IVAC কেন্দ্রগুলো হলো: ঢাকা (বারিধারা), চট্টগ্রাম (১২ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে পুনরায় চালু), রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, ময়মনসিংহ, যশোর, রংপুর, বরিশাল এবং মিরপুর (ঢাকা) — শনিবার শুধুমাত্র মহিলা আবেদনকারীদের জন্য।

অনলাইনে আবেদন করতে ভিজিট করুন: www.ivacbd.com

ভিসা আবেদনের ধাপ (Step-by-Step)

ধাপ ১: indianvisaonline.gov.in বা ivacbd.com-এ গিয়ে অনলাইন ফরম পূরণ করুন।

ধাপ ২: আবেদন ফরম সাবমিট করে প্রিন্ট নিন এবং স্বাক্ষর করুন।

ধাপ ৩: নিকটতম IVAC কেন্দ্রে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন।

ধাপ ৪: নির্ধারিত তারিখে সব কাগজপত্র ও ফি নিয়ে IVAC-এ যান।

ধাপ ৫: পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে অনলাইনে ভিসার স্ট্যাটাস চেক করুন।

ধাপ ৬: ভিসা অনুমোদন হলে পাসপোর্ট সংগ্রহ করুন।

টিপস: ট্যুরিস্ট ভিসার ক্ষেত্রে নিশ্চিত বিমান টিকেটসহ সরাসরি IVAC-তে আবেদন করতে পারবেন — আলাদা অ্যাপয়েন্টমেন্টের প্রয়োজন নেই (ভ্রমণের তারিখের ৩ মাস আগে পর্যন্ত)।

দুই দেশের সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বর্তমান পরিস্থিতি ইতিবাচক। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, উভয় দেশের মধ্যে সদিচ্ছা থাকলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য ভারতকে ধন্যবাদও জানানো হয়েছে। শেখ হাসিনার বিষয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগোনো হবে বলে জানানো হয়েছে এবং ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল না করার বিষয়েও ভারতকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন সরকার ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে, যা আগামী দিনে সম্পূর্ণ ভিসা পুনরুদ্ধারের পথ সুগম করবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: ইন্ডিয়ান ভিসা কি এখন চালু আছে?

হ্যাঁ, সীমিতভাবে মেডিকেল, স্টুডেন্ট ও ডাবল-এন্ট্রি ভিসা চালু আছে। বিজনেস ও পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ভিসা আগামী সপ্তাহ (২০–২৬ এপ্রিল ২০২৬) থেকে চালু হওয়ার কথা।

প্রশ্ন ২: ট্যুরিস্ট ভিসা কখন চালু হবে?

সরকারিভাবে এখনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা হয়নি, তবে বিজনেস ও মেডিকেল ভিসার পরেই ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

প্রশ্ন ৩: ভিসার আবেদন কোথায় করতে হবে?

www.ivacbd.com-এ অনলাইনে আবেদন করে নিকটতম IVAC কেন্দ্রে জমা দিতে হবে।

প্রশ্ন ৪: জরুরি মেডিকেল ভিসা কত দ্রুত পাওয়া যায়?

জরুরি ক্ষেত্রে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেও মেডিকেল ভিসা পাওয়া সম্ভব।

প্রশ্ন ৫: ভিসার স্ট্যাটাস কীভাবে জানব?

IVAC ওয়েবসাইটে পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে ভিসার অবস্থা যাচাই করা যাবে।

উপসংহার

দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর ইন্ডিয়ান ভিসা ২০২৬ পুনরায় চালু হওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। ১৩ এপ্রিল ২০২৬-এর সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই মেডিকেল ও বিজনেস ভিসা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে। ট্যুরিস্ট ভিসাও শীঘ্রই স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যারা ভারতে চিকিৎসা বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে যেতে চান, তারা এখনই কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন এবং নিয়মিত IVAC ওয়েবসাইট চেক করুন।


Comments

Post a Comment