বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের গৃহীত কিছু সিদ্ধান্তে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা এবং দুর্নীতি দমনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে রাষ্ট্র ‘পিছিয়ে যাচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন না ঘটায় তাদের ওপর আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে সংস্থার আনুষ্ঠানিক অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সরকার মুখে জুলাই সনদের চেতনা বাস্তবায়নের কথা বললেও কাজে তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারছে না। বিশেষ করে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত না করে পর্যালোচনার নামে ঝুলিয়ে রাখা ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত করার শামিল।”
উল্লেখ্য, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেগুলো উত্থাপন করা হয় এবং যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু আইনে পরিণত করার উদ্যোগকে টিআইবি সাধুবাদ জানালেও বাকি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
লিখিত বক্তব্যে ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত সংশোধনী অধ্যাদেশগুলোর মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়ার যে ক্ষমতা সরকার নিজের হাতে রেখেছে, তা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থি। এছাড়া সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশটিতে মহা হিসাব-নিরীক্ষকের সাংবিধানিক মর্যাদা ও স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ রহিত করার মাধ্যমে সরকার এই খাতকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এছাড়া মানবাধিকার কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংক্রান্ত ১৬টি অধ্যাদেশ শক্তিশালী করার অজুহাতে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হিসেবে গুম প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াগুলো থমকে যাওয়াকে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে টিআইবি বলেছে, প্রস্তাবিত কমিশনকে আরও বেশি সরকারি নিয়ন্ত্রণের অধীনে আনার চেষ্টা চলছে, যা সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যের বিরোধী। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সরকার মোটা দাগে গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিগুলোকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। আইনমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এসব অধ্যাদেশকে 'যুগোপযোগী' করার যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা সময়ক্ষেপণ এবং দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।”
টিআইবি সরকারকে সতর্ক করে বলেছে যে, যদি এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দ্রুত স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না হয়, তবে দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ হবে। সংস্থাটি অবিলম্বে গুম প্রতিরোধ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকারী অধ্যাদেশগুলো কোনো কাটছাঁট ছাড়াই আইনে পরিণত করার দাবি জানিয়েছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পুলিশ কমিশন ও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।

Comments
Post a Comment