সর্বশেষ সংবাদ
সংবাদ লোড করা হচ্ছে...
আপনি আন্তর্জাতিক বিষয়ক এই লেখাটি পড়ছেন

ভারতীয় ভিসা আপডেট ২০২৬: নতুন নিয়ম, ই-অ্যারাইভাল কার্ড এবং ট্যুরিস্ট ভিসার বর্তমান পরিস্থিতি

প্রকাশিত: এপ্রিল ০৬, ২০২৬

 

ভারতীয় পাসপোর্ট 
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য ভারত সবসময়ই পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা কিংবা ভ্রমণ—প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ প্রতিবেশী দেশটিতে যাতায়াত করেন। তবে গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় ভিসা প্রাপ্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উৎকণ্ঠা কাজ করছে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে তাতে নতুন মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাই-কমিশন ভিসা সংক্রান্ত বেশ কিছু নতুন আপডেট এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করেছে।

​১. ই-অ্যারাইভাল কার্ড (e-Arrival Card): ডিজিটাল যুগের নতুন নিয়ম

​১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো ডিজিটাল ই-অ্যারাইভাল কার্ড। আগে বিমানে বা স্থলবন্দরে প্রবেশের সময় হাতে লিখে একটি ইমিগ্রেশন কার্ড পূরণ করতে হতো। এখন থেকে সেই প্রথা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে।

নিয়মাবলি:

  • কখন পূরণ করবেন: ভারত ভ্রমণের অন্তত ৭২ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টা আগে অনলাইনে নির্দিষ্ট পোর্টালে এই ফর্ম পূরণ করতে হবে।
  • কোথায় পাবেন: ভারত সরকারের 'সু-স্বাগতম' (Su-Swagatam) মোবাইল অ্যাপ অথবা অফিসিয়াল ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইট থেকে এটি পূরণ করা যাবে।
  • প্রয়োজনীয় তথ্য: আপনার পাসপোর্টের বিবরণ, ভারতে অবস্থানের ঠিকানা, কন্টাক্ট নম্বর এবং কোভিডের পর থেকে যুক্ত হওয়া স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সাধারণ তথ্য এখানে দিতে হবে।
  • QR কোড: ফর্মটি সাবমিট করার পর একটি ইউনিক কিউআর (QR) কোড জেনারেট হবে। এটি আপনার ফোনে সেভ রাখতে হবে অথবা প্রিন্ট করে নিতে হবে। বিমানবন্দরে বা স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন অফিসার এটি স্ক্যান করে আপনার এন্ট্রি নিশ্চিত করবেন।

​২. ট্যুরিস্ট ভিসা (Tourist Visa): বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা

​বর্তমানে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে যে স্থবিরতা শুরু হয়েছিল, ২০২৬-এর এই সময়ে এসে তা অনেকটাই কেটে যাওয়ার মুখে।

সর্বশেষ আপডেট: বর্তমানে ভারত সরকার সীমিত পরিসরে 'ফ্যামিলি ভিজিট' এবং বিশেষ প্রয়োজনে ট্যুরিস্ট ভিসা প্রদান করছে। তবে গত কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা অনুযায়ী, আগামী মে ২০২৬-এর মধ্যে সাধারণ ট্যুরিস্ট ভিসা পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের চাপ সামলাতে ভারতীয় আইভ্যাক (IVAC) সেন্টারগুলো তাদের স্লট সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

​৩. মেডিকেল ভিসা (Medical Visa): অগ্রাধিকার ও দ্রুত সেবা

​যাদের গুরুতর অসুস্থতা রয়েছে, তাদের জন্য মেডিকেল ভিসা পাওয়া এখন আগের চেয়ে সহজ করা হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মেডিকেল ভিসার আবেদন যাচাই করা হচ্ছে।

  • প্রয়োজনীয় নথিপত্র: বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের রেফারেন্স লেটার এবং ভারতের সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার বাধ্যতামূলক।
  • মেডিকেল অ্যাটেনডেন্ট ভিসা: একজন রোগীর সাথে সর্বোচ্চ দুইজন অ্যাটেনডেন্ট যেতে পারবেন। তবে প্রত্যেকের আলাদা আবেদন করতে হবে।

​৪. স্টুডেন্ট ও বিজনেস ভিসা

​শিক্ষার্থী এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া এখন প্রায় স্বাভাবিক। যারা ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন, তারা কনফার্মেশন লেটার দেখালে দ্রুত ভিসা পাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা প্রদানের হার ২০% বাড়ানো হয়েছে।

​৫. আইভ্যাক (IVAC) সেন্টারগুলোর বর্তমান কার্যক্রম

​বর্তমানে ঢাকা (যমুনা ফিউচার পার্ক), চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট এবং খুলনার আইভ্যাক সেন্টারগুলো পূর্ণোদ্যমে কাজ করছে। তবে দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে বায়োমেট্রিক সিস্টেমে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

  • স্লট বুকিং: এখন থেকে ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট বুক করার সময় আবেদনকারীর মোবাইল নম্বরে একটি ওটিপি (OTP) পাঠানো হচ্ছে, যা দালালের মাধ্যমে বাল্ক বুকিং রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
  • পাসপোর্ট ডেলিভারি: অনেক ক্ষেত্রে এখন স্পিড পোস্ট বা কুরিয়ারের মাধ্যমে পাসপোর্ট সরাসরি আবেদনকারীর ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।

​৬. স্থলবন্দর ভিত্তিক বিধিনিষেধ ও আপডেট

​অনেকেই জানতে চান কোন রুট দিয়ে যাতায়াত করা সুবিধাজনক। বর্তমানে বেনাপোল-পেট্রাপোল, আখাউড়া-আগরতলা এবং বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি স্থলবন্দরগুলোতে ভিড় সবচেয়ে বেশি।

  • বেনাপোল-পেট্রাপোল: এই রুটে আধুনিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল চালু হওয়ায় ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া দ্রুত হচ্ছে। তবে ই-অ্যারাইভাল কার্ড ছাড়া এই রুটে প্রবেশে বিড়ম্বনা হতে পারে।
  • রেলপথ: মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেসের টিকেট কাটার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন আপনার ভিসায় সংশ্লিষ্ট রুট (Rail) উল্লেখ আছে কি না।

​৭. ভিসা ফি ও আনুষঙ্গিক খরচ

​ভারতীয় ভিসার আবেদন ফি (Processing Fee) বর্তমানে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে (ক্যাটাগরি ভেদে ভিন্ন হতে পারে)। এটি সাধারণত অনলাইনে বা অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। অতিরিক্ত কোনো অর্থ লেনদেন না করার জন্য হাই-কমিশন বারবার সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

​৮. কেন ভিসা রিজেক্ট হতে পারে? (সতর্কতা)

​সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫% আবেদন বাতিল হচ্ছে ছোটখাটো ভুলের কারণে। রিজেকশন এড়াতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন:

  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট: গত ৩ মাসের লেনদেনসহ ব্যাংক স্টেটমেন্টে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স (জনপ্রতি অন্তত ২০-৩০ হাজার টাকা) থাকা জরুরি।
  • পেশার প্রমাণপত্র: এনওসি (NOC) বা ট্রেড লাইসেন্সের তথ্য ভুল থাকলে ভিসা সরাসরি বাতিল হতে পারে।
  • ছবি: ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা এবং সাম্প্রতিক (৩ মাসের পুরনো নয়) হতে হবে। চশমা পরে ছবি তোলা যাবে না।

​৯. পর্যটকদের জন্য বিশেষ টিপস

​ভারত ভ্রমণে যাওয়ার আগে অবশ্যই আপনার স্মার্টফোনে 'সু-স্বাগতম' অ্যাপটি ইনস্টল করে নিন। ভারতের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে প্রবেশের টিকেট এখন অনলাইনে এই অ্যাপের মাধ্যমে কাটা যায়, যা লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলা কমায়। এছাড়া আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ অন্তত ৬ মাস আছে কি না তা ভ্রমণের আগেই নিশ্চিত করুন।

​উপসংহার

​ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে ভিসা প্রক্রিয়া দীর্ঘকাল বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। ২০২৬ সালের এই দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে আমরা আশা করতে পারি, খুব শীঘ্রই পর্যটন শিল্প আবারও প্রাণ ফিরে পাবে। আপনি যদি ভারত ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে এখন থেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গোছাতে শুরু করুন এবং নিয়মিত ভারতীয় হাই-কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে চোখ রাখুন।


Comments

Post a Comment