আয়ের উৎস সীমিত হয়ে পড়লেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সরকারের ব্যয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে সরকার। দেশের নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং জ্বালানি সংকটের মুখে ব্যাংক থেকে এই অতিরিক্ত ধার ভবিষ্যতে চরম আর্থিক দুর্দশা ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু মার্চ মাস শেষ হতেই সরকার ১ লাখ ১২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেলেছে। অর্থবছর শেষ হতে আরও তিন মাস বাকি থাকতেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি ধার করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামী ৮ এপ্রিল নতুন করে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের চাহিদা দিয়েছে সরকার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নামাই ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ার প্রধান কারণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা পিছিয়ে আছে রাজস্ব আদায়। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট জাহিদ হোসেন এই পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “আয়ের পথ না বাড়িয়ে খরচ বাড়িয়ে চললে দুর্দশা বাড়ানো ছাড়া আর কিছু হবে না। একদিকে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে জ্বালানি ও সারে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, কিন্তু রাজস্ব বাড়ছে না। ঋণের টাকা তো শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করতেই হবে।” তিনি সতর্ক করেন যে, সরকার ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নিলে বেসরকারি খাত বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন পাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম মনে করেন, বর্তমানে যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের চাহিদা নেই। ফলে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি এড়াতে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। তিনি বলেন, “ব্যাংকগুলো নিরাপদ আয়ের জন্য সরকারকে টাকা দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এর ফলে সরকারের সুদ বাবদ ব্যয়ের বোঝা পাহাড়সম হয়ে উঠছে। এটি আর্থিক শৃঙ্খলাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলবে।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশের ঘরে, যা বিনিয়োগ পরিস্থিতির স্থবিরতাকেই নির্দেশ করে। অন্যদিকে, ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। জানুয়ারি মাসে ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেও সরকার যদি নিজের ঋণের লাগাম টেনে না ধরে, তবে বাজারে তারল্য সংকট এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সামনের তিন মাসে সরকারের ঋণের চাহিদা আরও বাড়লে তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভিতকে দুর্বল করে দিতে পারে।

Comments
Post a Comment