![]() |
| সাবমেরিন ক্যাবল |
কী হচ্ছে আসলে?
বাংলাদেশের ইন্টারনেট সংযোগের মূল ভরসা দুটি সাবমেরিন ক্যাবল — সমুদ্রের গভীরে বিছানো বিশাল আন্ডারওয়াটার কেবল, যার মাধ্যমে আমাদের তথ্য ছুটে যায় সিঙ্গাপুর, ইউরোপ, আমেরিকায়। এর একটি হলো SEA-ME-WE-5 (SMW-5), যা কুয়াকাটায় সংযুক্ত। অপরটি হলো SEA-ME-WE-4, কক্সবাজারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত Bangladesh Submarine Cables PLC (BSCPLC) জানিয়েছে, SEA-ME-WE-5 ক্যাবলে "S1.5.1 Shunt Fault Repair" নামের একটি জরুরি মেরামত কাজ শুরু হয়েছে ৯ এপ্রিল রাত ১০টায় এবং শেষ হবে ১৩ এপ্রিল সকাল ৬টায় — মোট প্রায় ৮০ ঘণ্টা। এই সময়ে সিঙ্গাপুর রুটের ট্র্যাফিক সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীমিত।
সাবমেরিন ক্যাবল কী — সহজ ভাষায়
আমরা যখন ফেসবুকে স্ক্রল করি বা ইউটিউবে ভিডিও দেখি, তখন সেই ডেটা শুধু বাতাসে ভেসে আসে না। লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার দীর্ঘ অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল সমুদ্রের তলা দিয়ে মহাদেশ থেকে মহাদেশে সংযুক্ত — এগুলোই সাবমেরিন ক্যাবল।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের বড় অংশ আসে এই দুটি ক্যাবল থেকে। SMW-5 একাই বহন করে প্রায় ১.৭ টেরাবিট/সেকেন্ড ক্যাপাসিটি। এটি মেরামতে থাকায় সিঙ্গাপুর রুটের ট্র্যাফিক সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তুলনায় SEA-ME-WE-4 দেয় মাত্র ৮০০ গিগাবিট/সেকেন্ড — অর্থাৎ দেশের মোট সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন কাজ করছে।
কতটা খারাপ হতে পারে?
সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে না। তবে যা অনুভব করতে পারেন:
ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, প্রাইম ভিডিওতে বারবার বাফারিং। Zoom, Google Meet, Microsoft Teams কল ভাঙা বা ফ্রিজ হওয়া। গুগল ড্রাইভ, ড্রপবক্সে ফাইল আপলোড ও ডাউনলোড ধীরগতি। আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট লোড হতে বেশি সময় নেওয়া। অনলাইন গেমিং-এ হাই পিং ও ল্যাগ।
তবে দেশীয় সার্ভারে হোস্ট করা ওয়েবসাইট যেমন প্রথম আলো, ডেইলি স্টার বা দেশীয় ব্যাংকিং অ্যাপ তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হবে।
এই সময়ে আপনার কী করা উচিত?
১. দরকারি ফাইল আগেই ডাউনলোড করুন। ক্লাস নোট, প্রেজেন্টেশন বা প্রজেক্ট ফাইল — যা লাগবে এখনই অফলাইনে সেভ করুন।
২. ভিডিও কলের বিকল্প রাখুন। অফিস বা ক্লাসের মিটিং থাকলে আগেই জানান — ভিডিও না হলে শুধু অডিও কল বা ফোনে করার ব্যবস্থা রাখুন।
৩. রাত ১০টার পর ভারী কাজ এড়িয়ে চলুন। মেরামত কাজ মূলত রাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। বড় ফাইল আপলোড বা আপডেট দিনের বেলা করুন।
৪. ভিডিও কোয়ালিটি কমিয়ে দিন। YouTube ও Netflix-এ Auto বা 480p সেট করুন — ব্যান্ডউইথ কম লাগবে, বাফার কমবে।
৫. স্পটিফাই ও পডকাস্ট অফলাইনে ডাউনলোড করুন। এখনই পছন্দের গান বা পডকাস্ট ডাউনলোড করুন, পরে নেট ছাড়াই শুনুন।
৬. দেশীয় কন্টেন্ট বেছে নিন। বাংলাদেশ থেকে হোস্ট করা ওয়েবসাইট ও অ্যাপ এই সময়ে বেশি দ্রুত কাজ করবে।
৭. অকারণে রাউটার রিস্টার্ট দেবেন না। এটা ক্যাবলের সমস্যা, রাউটারের নয়। বারবার রিস্টার্ট দিলে কোনো লাভ নেই।
ভবিষ্যতে কী হবে?
সুখবর হলো, বাংলাদেশ শিগগিরই তৃতীয় একটি সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে যুক্ত হতে যাচ্ছে। Summit Communications, CdNet ও Metacore Subcom-এর কনসোর্টিয়াম কক্সবাজার থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি প্রাইভেট সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করছে, যা ২০২৬ সালেই সক্রিয় হওয়ার কথা। এছাড়া SEA-ME-WE-6-এও বাংলাদেশ যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ভবিষ্যতে একটি ক্যাবলে সমস্যা হলেও বাকিগুলো সহজেই ট্র্যাফিক সামলাতে পারবে।
শেষ কথা
ইন্টারনেট স্লো দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এটি একটি পরিকল্পিত মেরামত কাজ, যা ১৩ এপ্রিল সকালের মধ্যে শেষ হবে। সমুদ্রের তলায় কর্মীরা আমাদের ডিজিটাল জীবন ঠিক করছেন — একটু ধৈর্য ধরুন। এই কয়েকটা দিন পরিকল্পনামতো ব্যবহার করুন — অফলাইনে কাজ গুছিয়ে নিন, বইয়ের পাতা উল্টান, অথবা একটু বিশ্রাম নিন। দ্রুত ইন্টারনেট আবার ফিরে আসছে।

Comments
Post a Comment