সর্বশেষ সংবাদ
সংবাদ লোড করা হচ্ছে...
আপনি বাংলাদেশ বিষয়ক এই লেখাটি পড়ছেন

তেল শেষ হলে কী হবে বাংলাদেশের?

প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬

 

বাংলাদেশে তেল সংকটের প্রতীকী চিত্র। এআই
মধ্যপ্রাচ্যের আগুন এখন আর শুধু ইরানের মাটিতে জ্বলছে না। সেই আগুনের তাপ এসে লাগছে বাংলাদেশের প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে, প্রতিটি কলকারখানায়, প্রতিটি ঘরের রান্নাঘরে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বের জ্বালানি বাজার এমনভাবে টলমল করছে যে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন — বাংলাদেশ হতে পারে বিশ্বের প্রথম দেশ যেখানে তেলের ট্যাংক পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাবে।

কীভাবে শুরু হলো এই সংকট?

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' নামে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অন্তত নয়টি শহরে সামরিক স্থাপনা, পারমাণবিক কেন্দ্র এবং সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে।  (alokitobangladesh) এর জেরে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লাগে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে।

ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলিতে আক্রমণ করে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়।  (Wikipedia) এই প্রণালী দিয়ে এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়।  (The Daily Ittefaq) ১৮ মার্চ ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায়, যার ফলে জ্বালানি উৎপাদনে প্রভাব পড়ে। একই দিন পাল্টা হামলায় ইরান কাতারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়।  (Wikipedia)

বাংলাদেশ কেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

সমস্যার গভীরে আছে একটি কঠিন সত্য। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল।  (The Daily Ittefaq) মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ বন্ধ হলে বাংলাদেশের হাতে বিকল্প অত্যন্ত সীমিত।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের প্রথম তেল-শূন্য দেশ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ।  (The Daily Ittefaq) আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) প্রধান ফাতিহ বিরল জানিয়েছেন, মার্চের তুলনায় এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেল সরবরাহের ঘাটতি দ্বিগুণ হবে।  (Itvbd)

সংখ্যায় বাংলাদেশের ক্ষতির চিত্র

গবেষণা সংস্থা সানেম তাদের সর্বশেষ বিশ্লেষণে তিনটি প্রধান সংকটক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে — জ্বালানি, রেমিট্যান্স এবং বাণিজ্য। তাদের মডেল বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদি বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তাহলে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১.২ শতাংশ কমে যেতে পারে। রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ এবং আমদানি ১.৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং প্রকৃত মজুরি প্রায় এক শতাংশ কমে যেতে পারে।  (Outlookbangla)

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা এমবার জানাচ্ছে, জ্বালানি আমদানির কারণে বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চলতি বছর এই ব্যয় আরও ৩০ বিলিয়ন ডলার বেশি হতে পারে।  (Deshrupantor) জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত বিশ্বের অন্তত ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ এখন ঝুঁকির মুখে। কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি সংকট আরও গভীর হয়েছে।  (Outlookbangla)

সরকার কী করছে?

৮ এপ্রিল সরকার জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আরও ৩ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।  (DesheBideshe) পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও আজারবাইজানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিকল্প সরবরাহের চেষ্টা চলছে। রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের অনুরোধও জানানো হয়েছে।  (The Daily Ittefaq) এপ্রিল মাসে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ৪০ হাজার টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যা মার্চের তুলনায় দ্বিগুণ।  (Itvbd)

তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১১ এপ্রিল স্পষ্ট করে বলেছেন — যুদ্ধবিরতি হলেও জ্বালানি সংকট থাকবে।  (Bangladesh Pratidin)

আশার আলো কোথায়?

ইরান হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে সম্মত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।  (DesheBideshe) ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনাও শুরু হয়েছে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন — এটি স্থায়ী সমাধান নয়। এমবার পরামর্শ দিচ্ছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দ্রুত সাশ্রয়ী ও টেকসই সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ জরুরি।  (Deshrupantor)

সবশেষ কথা

ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশকে একটি বেদনাদায়ক সত্যের মুখোমুখি করেছে — যখন বিশ্বের এক কোণে যুদ্ধ লাগে, তখন হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশের একজন কৃষক মাঠে যেতে পারেন না, একজন শ্রমিকের কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, একটি পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলে না। জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর কেবল অর্থনীতির বিষয় নয় — এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।


Comments

Post a Comment