সর্বশেষ সংবাদ
সংবাদ লোড করা হচ্ছে...
আপনি স্বাস্থ‍্য বিষয়ক এই লেখাটি পড়ছেন

দুপুরের ঘুম (ভাতঘুম) — শরীরের জন্য ভালো নাকি খারাপ? জানুন বিজ্ঞান কী বলে

প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০২৬

 

ভাত খেয়ে একটু শুয়ে পড়া — এই অভ্যাসটা বাঙালির রক্তে মিশে আছে। দুপুরের খাবারের পর চোখ দুটো ভারী হয়ে আসে, শরীর বিছানার টান অনুভব করে। আমরা এই মিষ্টি ঘুমকে ভালোবেসে ডাকি "ভাতঘুম"। কিন্তু অনেকেই ভাবেন এটা আলসেমির অভ্যাস, শরীরের ক্ষতি করে, ওজন বাড়ায়। সত্যিই কি তাই? নাকি দুপুরের এই ঘুম আসলে শরীরের জন্য একটি আশীর্বাদ?

আসুন বিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের আলোকে বিষয়টি জেনে নিই।দুপুরে কেন ঘুম পায়? এর পেছনে কারণ কী?

খাবার খাওয়ার পর শরীরে ঘুমের অনুভূতি হওয়াটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। ভারী খাবার হজম করতে শরীরের মোট শক্তির ৬০ থেকে ৭৫ ভাগ ব্যয় হয়ে যায়। এই বিশাল পরিমাণ শক্তি খরচ হওয়ার কারণেই মস্তিষ্ক ও শরীর ক্লান্ত অনুভব করে এবং ঘুমের সংকেত পাঠায়। শুধু কার্বোহাইড্রেট নয়, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেলেও একই ঘটনা ঘটে।

এছাড়া দুপুর ১টা থেকে ৩টার মধ্যে আমাদের শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবঘড়ি স্বাভাবিকভাবেই একটু নিচে নামে। এটি বিবর্তনের একটি অংশ — শুধু বাঙালি নয়, পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই এই সময়ে হালকা ক্লান্তি অনুভব করেন।

ভাতঘুমের উপকারিতা — বিজ্ঞান কী বলে?

১. স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ায়

যারা দুপুরে অন্তত আধঘণ্টা ঘুমান, তাদের মস্তিষ্ক অন্যদের তুলনায় বেশি তীক্ষ্ণ থাকে — এমনটাই দেখা গেছে একাধিক গবেষণায়।  (Jagonews24) আমেরিকান জেরিয়াট্রিক্স সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ৩০ থেকে ৯০ মিনিটের দুপুরের ঘুম প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্কের জন্য উপকারী, তবে এক ঘণ্টার বেশি হলে সমস্যা দেখা দিতে পারে।  (Jugantor)

২. সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়

সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে ভাতঘুম। ঠিকভাবে যদি দুপুরে ঘুমাতে পারেন তাহলে সৃজনশীলতা বাড়তে বাধ্য, কারণ দুপুরে ঘুমে মস্তিষ্কের বিশ্রাম হয় খুব ভালো এবং চিন্তাশক্তিও বৃদ্ধি পায়।  (Jagonews24)

৩. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে

দুপুরের ঘুম রক্তচাপের ওপর ভালো প্রভাব ফেলে। রাতের ঘুমের থেকে দুপুরের ঘুম হয় অনেক শান্তিতে — তাড়া থাকে না, অ্যালার্মও দিতে হয় না, তাই ঘুমটা হয় নিশ্চিন্তে।  (Jagonews24)

৪. মানসিক চাপ কমায়, মন ভালো করে

মাথা গরম থাকলে বা মন খারাপ থাকলে দুপুরের ঘুম দরকার। গবেষণা বলছে, এ সময় ঘুমে স্নায়ুর ওপর চাপ কমে এবং মন ভালো হয়।  (Jagonews24)

৫. কর্মক্ষমতা ও সতর্কতা বাড়ায়

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দুপুরে ২০-৩০ মিনিটের একটি "পাওয়ার ন্যাপ" শরীর ও মনের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি মনোযোগ বাড়ায়, ক্লান্তি কমায় এবং কর্মক্ষমতা উন্নত করে।  (Daily Janakantha)

ভাতঘুমের ক্ষতিকর দিক — কখন সমস্যা হয়?

উপকারিতার পাশাপাশি দুপুরের ঘুমের কিছু নেতিবাচক দিকও আছে, বিশেষ করে নিয়ম না মানলে।

ওজন বৃদ্ধি ও বিপাকক্রিয়া কমে যাওয়া: যারা ওজন কমাতে চান তাদের দুপুরের ঘুম এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ দুপুরে ঘুমালে মেটাবলিজম কমে যায় এবং ওজন ও ভুঁড়ি বাড়তে পারে।  (Dhakapost)

রাতের ঘুম নষ্ট হওয়া: দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস করলে খুব স্বাভাবিকভাবেই রাতের ঘুমে ঘাটতি পড়ে এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার রুটিনও এলোমেলো হয়ে যায়।  (Dhakapost)

হজমের সমস্যা: খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়া একেবারেই ঠিক নয়, কারণ তাতে পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক ক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পেটের মধ্যে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে বুক জ্বালাপোড়া ও গলা জ্বলার মতো অস্বস্তি হতে পারে।  (The Daily Star Bangla)

ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি: একাধিক গবেষণায় টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে দিনে এক ঘণ্টার বেশি ঘুমের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এছাড়াও কার্ডিওভাসকুলার রোগ ও হজম সমস্যাও হতে পারে।  (Jugantor)

শরীরের তাপমাত্রার তারতম্য: বিকেলে বেশিক্ষণ ঘুমালে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস কাজ করা বন্ধ করে দেয়, ফলে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রি কমে যায়। বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গে এই তারতম্যের ফলে হজমশক্তি ও শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।  (The Daily Star Bangla)

কাদের জন্য ভাতঘুম ভালো, কাদের জন্য নয়?

শিশুরা দুপুরে ঘুমাতে পারে। যারা অনেক ভোর থেকেই পরিশ্রম করেন তাদের জন্যও ভাতঘুম ভালো। এ ছাড়া বয়স্ক মানুষ, দীর্ঘক্ষণ ভ্রমণ করেছেন এমন মানুষ, অসুস্থ, দুর্বল ও কম ওজনে ভুগছেন এমন ব্যক্তিরা দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারেন।  (RTV Bangladesh)

অন্যদিকে যারা কোষ্ঠকাঠিন্যের রোগী, হজমের সমস্যায় ভুগছেন কিংবা যাদের শরীরে ব্যথা বেশি তারা দুপুরে একেবারেই ঘুমাবেন না।  (RTV Bangladesh) যাদের গ্যাসের সমস্যা রয়েছে, ওজন অনেক বেশি বা জাঙ্ক ফুড খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে, তারাও দুপুরের ঘুম এড়িয়ে চলবেন।  (Protidiner Sangbad)

ভাতঘুমের সঠিক নিয়ম — কতক্ষণ এবং কীভাবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুরের ঘুম হওয়া উচিত ২০ থেকে ৩০ মিনিটের। দুপুর ৩টা বেজে যাওয়ার পর না ঘুমানোই ভালো, কারণ দুপুরে বেশি ঘুমালে ঘুমের চক্র ব্যাহত হতে পারে এবং অনিদ্রার সমস্যা দেখা দিতে পারে।  (Jugantor)

যারা দুপুরে ঘুমাবেন, খাবার খাওয়া ও শোয়ার মধ্যে অন্তত ৩০ মিনিটের ব্যবধান রাখবেন। এই সময়ের মধ্যে ১০০ স্টেপ হেঁটে নিতে পারেন।  (Protidiner Sangbad)

ভাতঘুম নিতে চাইলে শরীর ও মনে উদ্দীপনা তৈরি করে এমন কিছু থেকে সরে আসুন, চা-কফি এড়িয়ে চলুন। ঘরের আলো কমিয়ে দিন, শব্দের উৎস নিয়ন্ত্রণ করুন এবং আরামদায়ক জায়গায় শুয়ে বা বসে চোখ বন্ধ করুন।  (RTV Bangladesh)

উপসংহার: ভাতঘুম ভালো, কিন্তু নিয়ম মেনে

দুপুরে ঘুমানো শরীর ও মনকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ায়। তবে এটি হতে হবে নিয়ন্ত্রিত এবং সংক্ষিপ্ত। নিয়ম মেনে যদি দুপুরের ঘুমকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করা যায়, তবে এটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  (Ajkerdainik)

২০-৩০ মিনিটের একটি পাওয়ার ন্যাপ আপনার পুরো বিকেলটাকে করে দিতে পারে প্রাণবন্ত ও উৎপাদনশীল। অতিরিক্ত বা অনিয়মিত ঘুম এড়িয়ে চললে এই দুপুরের বিশ্রাম হবে আপনার শরীরের জন্য সত্যিকারের আশীর্বাদ।


Comments

Post a Comment