![]() |
| ছবি এআই |
প্রতিদিন সকালে উঠে আমরা অনেকেই সরাসরি ব্রাশ করতে বসি — কেউ খাওয়ার আগে, কেউ খাওয়ার পরে। কিন্তু কোনটি আসলে স্বাস্থ্যসম্মত? এই প্রশ্নটি সহজ মনে হলেও, দন্তচিকিৎসা বিজ্ঞানে এর উত্তর বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আসুন ডাক্তার ও গবেষকদের মতামতের ভিত্তিতে বিষয়টি বিস্তারিত জেনে নিই।
সকালে খাওয়ার আগে ব্রাশ করা কি ভালো?
বিশ্বের অধিকাংশ দন্তচিকিৎসক সকালে খাওয়ার আগে ব্রাশ করার পরামর্শ দেন। এর পেছনে বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে।
রাতে ঘুমানোর সময় মুখের ভেতর লালার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। লালা হলো মুখের প্রাকৃতিক জীবাণুনাশক। লালা কম থাকলে মুখে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবিস্তার করে। সারারাত ধরে এই ব্যাকটেরিয়া দাঁতের উপর একটি পাতলা আবরণ তৈরি করে, যাকে বলা হয় "প্লাক" বা ডেন্টাল প্লাক।
আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন (ADA)-এর মতে, সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে ব্রাশ করলে রাতভর জমে থাকা এই ব্যাকটেরিয়া ও প্লাক পরিষ্কার হয়ে যায়। এর ফলে নাস্তা খাওয়ার সময় ব্যাকটেরিয়া খাবারের সাথে পেটে যাওয়ার সুযোগ পায় না।
এছাড়া ব্রাশ করলে দাঁতের এনামেলের উপর ফ্লোরাইডের একটি সুরক্ষামূলক আবরণ তৈরি হয়, যা সকালের নাস্তায় থাকা চিনি ও অ্যাসিড থেকে দাঁতকে রক্ষা করে।
ডা. ব্রায়ান পারমার, যুক্তরাজ্যের একজন বিশিষ্ট দন্তচিকিৎসক, বলেন — "সকালে উঠে প্রথমেই ব্রাশ করা উচিত। এটি মুখের ব্যাকটেরিয়া পরিষ্কার করে এবং ফ্লোরাইড দিয়ে দাঁতকে সারাদিনের খাবারের জন্য প্রস্তুত করে।"
খাওয়ার পরে ব্রাশ করলে কী হয়?
অনেকের ধারণা, খাওয়ার পরে ব্রাশ করলে দাঁত সবচেয়ে পরিষ্কার থাকে। এই ধারণা আংশিক সঠিক, কিন্তু পুরোপুরি নয়।
খাবার খাওয়ার পর, বিশেষত অ্যাসিডিক খাবার বা ফলের রস পান করার পর, মুখের পিএইচ মাত্রা কমে যায় অর্থাৎ মুখ অ্যাসিডিক হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ করলে দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক ডেন্টিস্ট্রি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেন্টাল অ্যান্ড ক্র্যানিওফেশিয়াল রিসার্চ (NIDCR)-এর গবেষণা বলছে — খাওয়ার অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পরে ব্রাশ করা উচিত। এই সময়ের মধ্যে মুখের লালা স্বাভাবিকভাবেই অ্যাসিড নিরপেক্ষ করে এনামেলকে পুনরায় শক্তিশালী করে।
বিশ্বখ্যাত দন্ত গবেষক ড. আনা লুইসা ডুয়ার্তে জার্নাল অব ডেন্টাল রিসার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন যে কমলালেবুর রস পান করার পর সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ করা দাঁতের এনামেলের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করে, যা পরবর্তীতে দাঁত সংবেদনশীলতা ও ক্যাভিটির ঝুঁকি বাড়ায়।
রাতে ঘুমানোর আগে ব্রাশ কতটা জরুরি?
রাতে ঘুমানোর আগে ব্রাশ করা দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্রাশিং হিসেবে বিবেচিত। ADA এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) উভয়েই এই বিষয়ে একমত।
কারণটি সহজ — রাতে ঘুমানোর সময় মুখে লালার উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দিনে যা খেয়েছেন, তার অবশিষ্টাংশ দাঁতে লেগে থাকলে রাতভর ব্যাকটেরিয়া সেগুলো ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে। এই অ্যাসিড দাঁতের এনামেল ধীরে ধীরে ক্ষয় করে এবং মাড়িতে সংক্রমণ তৈরি করে।
বিখ্যাত ব্রিটিশ দন্ত বিশেষজ্ঞ ড. নিজোনি রানিংওয়াটার বলেন — "যদি দিনে দুবারের মধ্যে একটিই ব্রাশ করতে হয়, তবে রাতেরটি বেছে নিন। কারণ রাতের ব্রাশিং দাঁতের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।"
মাউথওয়াশ কখন ব্যবহার করবেন?
অনেকেই ব্রাশের পরপরই মাউথওয়াশ ব্যবহার করেন, কিন্তু এটি সঠিক নয়। ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS)-এর পরামর্শ হলো, ব্রাশের সঙ্গে সঙ্গে মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে টুথপেস্টের ফ্লোরাইড ধুয়ে যায়। তাই মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে চাইলে ব্রাশের অন্তত ৩০ মিনিট পরে করুন, অথবা খাওয়ার পরে আলাদাভাবে ব্যবহার করুন।
সঠিক ব্রাশিং রুটিন কেমন হওয়া উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও গবেষণার ভিত্তিতে আদর্শ দৈনিক ব্রাশিং রুটিন হওয়া উচিত এইভাবে — সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছু খাওয়ার আগেই ব্রাশ করুন। যদি নাস্তায় অ্যাসিডিক কিছু খান যেমন ফল বা জুস, তাহলে খাওয়ার পরে ব্রাশ করতে চাইলে ন্যূনতম ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে অবশ্যই ব্রাশ করুন এবং ব্রাশের পর পানি দিয়ে কুলি না করে ফ্লোরাইডটুকু দাঁতে থাকতে দিন।
কতক্ষণ ব্রাশ করবেন?
ADA-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিবার কমপক্ষে ২ মিনিট ব্রাশ করা উচিত। অধিকাংশ মানুষ ৪৫ থেকে ৭০ সেকেন্ডের বেশি ব্রাশ করেন না, যা যথেষ্ট নয়। দাঁতের চারটি অংশকে সমানভাবে ভাগ করে প্রতিটিতে ৩০ সেকেন্ড করে ব্রাশ করুন।
উপসংহার
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সকালে খাওয়ার আগে ব্রাশ করা বৈজ্ঞানিকভাবে সবচেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত। তবে রাতে ঘুমানোর আগের ব্রাশিং সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি খাওয়ার পরে ব্রাশ করতেই চান, তাহলে অবশ্যই ৩০ থেকে ৬০ মিনিট অপেক্ষা করুন, নইলে দাঁতের উপকার করতে গিয়ে বরং ক্ষতি করবেন।
দাঁতের যত্ন মানে শুধু ব্রাশ করা নয় — কখন এবং কীভাবে ব্রাশ করছেন, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ দাঁত মানে সুস্থ শরীর — কারণ মুখের স্বাস্থ্য সরাসরি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও হজমশক্তির সাথে সম্পর্কিত।

Comments
Post a Comment