সর্বশেষ সংবাদ
সংবাদ লোড করা হচ্ছে...
আপনি খেলাধুলা বিষয়ক এই লেখাটি পড়ছেন

অলিম্পিকের সবচেয়ে অদ্ভুত ম্যারাথন: বিষ খেয়ে সোনা জয়ের গল্প

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬

ছবিঃ এই আই

আজকের অলিম্পিক ম্যারাথনে আছে জিপিএস ট্র্যাকিং, প্রতি কয়েক কিলোমিটারে পানির স্টেশন, চিকিৎসক দল আর ক্যামেরার ঝাঁক। কিন্তু ১২০ বছরেরও আগে, ১৯০৪ সালে, ম্যারাথন ছিল এক অবিশ্বাস্য প্রহসন। কেউ গাড়িতে চড়ে ফিনিশ লাইনে পৌঁছে গেলেন, কেউ দৌড়ের মাঝখানে ঘুমিয়ে পড়লেন, আর বিজয়ী নিজেই ছিলেন প্রায় মৃত্যুর দোরগোড়ায়। চলুন জেনে নিই অলিম্পিক ইতিহাসের সবচেয়ে পাগলাটে দৌড়ের গল্প।

কোথায় আর কীভাবে শুরু হলো এই কাণ্ড?

১৯০৪ সালে প্রথমবার অলিম্পিক আয়োজিত হয় ইউরোপের বাইরে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসে। সমস্যা ছিল, একই সময়ে শহরে চলছিল বিশ্ব মেলা (World's Fair)। ফলে অলিম্পিক হারিয়ে গেল মেলার ভিড়ে, চলল প্রায় পাঁচ মাস ধরে। অনেক দেশ দূরত্বের কারণে খেলোয়াড়ই পাঠায়নি। ম্যারাথনে নামলেন মোট ৩২ জন, যাঁদের বেশিরভাগই আমেরিকান।

দৌড়ের দিন, ৩০ আগস্ট, তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ট্র্যাক বলতে ছিল ধুলোভরা কাঁচা রাস্তা, যেখানে একই সময়ে চলছিল ঘোড়ার গাড়ি আর মোটরগাড়ি। রাস্তার ধুলো দৌড়বিদদের চোখে-মুখে ঢুকছিল। আর পানি? পুরো ২৪ মাইলের পথে মাত্র একটি পানির স্টেশন, কারণ আয়োজকরা মনে করতেন, কম পানি খেলে শরীর "শক্ত" হয়। এটা তাঁরা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন প্রতিযোগীদের ওপর!

প্রতারক ফ্রেড লরজ: গাড়িতে চড়ে চ্যাম্পিয়ন

নিউ ইয়র্কের ফ্রেড লরজ প্রায় ১৩ কিলোমিটার দৌড়ানোর পর পায়ে খিঁচুনি ধরায় থেমে গেলেন। পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তাঁর ম্যানেজারের গাড়ি, উঠে বসলেন তিনি। প্রায় ১১ মাইল গাড়িতে আরাম করে যাওয়ার পর গাড়ি বিকল হলো। লরজ নেমে আবার দৌড়ানো শুরু করলেন, তাজা পায়ে, আর সবার আগে ঢুকে পড়লেন স্টেডিয়ামে।

দর্শকরা উল্লাসে ফেটে পড়ল। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের মেয়ে অ্যালিস রুজভেল্ট তাঁর গলায় বিজয়ীর মালা পরাতে এগিয়ে এলেন। ছবি তোলাও শুরু হয়ে গিয়েছিল। ঠিক তখনই অন্য দর্শকরা চেঁচিয়ে বলে উঠল, "লোকটা তো গাড়িতে চড়েছিল!"

লরজ হেসে বললেন, পুরোটাই নাকি তাঁর মজা। কর্তৃপক্ষ অবশ্য হাসেনি। তাঁকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হলো। তবে মজার কথা, নিষেধাজ্ঞা পরে তুলে নেওয়া হয়, আর ১৯০৫ সালে তিনি বোস্টন ম্যারাথন জিতে প্রমাণ করেন, তিনি আসলেই ভালো দৌড়বিদ ছিলেন!

আসল বিজয়ী টমাস হিকস: বিষ আর ব্র্যান্ডির ককটেল

লরজ বাদ পড়ায় সোনা গেল ইংল্যান্ডে জন্মানো আমেরিকান টমাস হিকসের হাতে। কিন্তু তাঁর জয়ের পেছনের গল্প আরও ভয়াবহ।

দৌড়ের মাঝপথে হিকস ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিলেন। তাঁর প্রশিক্ষকরা তখন তাঁকে দিলেন স্ট্রিকনিন (strychnine) নামের এক বিষাক্ত পদার্থ, ডিমের সাদা অংশ মিশিয়ে। তখনকার দিনে অল্প মাত্রার স্ট্রিকনিনকে উদ্দীপক হিসেবে ব্যবহার করা হতো, যদিও বেশি হলে এটা প্রাণঘাতী। পরে দ্বিতীয় দফায় আবার দেওয়া হলো একই জিনিস, এবার ব্র্যান্ডির সঙ্গে।

শেষ দিকে হিকস দৃশ্যত ঘোরের মধ্যে চলছিলেন। কল্পনার জগতে হাঁটছিলেন, চোখে ভুল দেখছিলেন। ফিনিশ লাইনে পৌঁছানোর সময় তাঁকে প্রায় দুই পাশ থেকে ধরে বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিল। তাঁর সময় ছিল ৩ ঘণ্টা ২৮ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড, যা অলিম্পিক ইতিহাসের অন্যতম ধীর ম্যারাথন জয়। দৌড় শেষ হতেই তিনি কার্যত অচেতন, চিকিৎসকরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টায় লেগে গেলেন। সৌভাগ্যবশত তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

কিউবার ডাকপিয়ন ফেলিক্স কারভাহাল: আপেল, জুয়া আর ঘুম

এই দৌড়ের সবচেয়ে মজার চরিত্র ফেলিক্স কারভাহাল, কিউবার এক ডাকপিয়ন। অলিম্পিকে যাওয়ার টাকা জোগাড় করতে তিনি হাভানার চত্বরে দৌড়ে দৌড়ে চাঁদা তুলেছিলেন। নিউ অরলিন্সে নামার পর সব টাকা জুয়ায় হারালেন। বাকি পথ গেলেন হেঁটে আর লিফট চেয়ে, কোনোমতে সেন্ট লুইসে পৌঁছালেন।

দৌড়ের দিন তিনি এলেন লম্বা প্যান্ট আর ভারী জুতো পরে। অন্য একজন প্রতিযোগী কাঁচি দিয়ে তাঁর প্যান্ট কেটে শর্টস বানিয়ে দিলেন। পথে তিনি মজা করে সমর্থকদের সঙ্গে গল্প জুড়লেন, ক্ষুধা পেলে বাগান থেকে আপেল তুলে খেলেন। আপেলগুলো ছিল পচা, তাই পেটব্যথা শুরু হলো। বিশ্রাম নিতে তিনি রাস্তার পাশে ঘুমিয়েই পড়লেন! ঘুম থেকে উঠে আবার দৌড় ধরে শেষ করলেন চতুর্থ স্থানে। অনেকের মতে, ঠিকঠাক প্রস্তুতি আর কম বিশ্রাম নিলে তিনিই জিততে পারতেন।

আফ্রিকার দুই দৌড়বিদ আর বুনো কুকুর

এই দৌড়ে অংশ নিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার তসোয়ানা সম্প্রদায়ের দুজন, লেন তাউ ও জ্যান মাশিয়ানি। তাঁরা সেন্ট লুইসে গিয়েছিলেন বিশ্ব মেলার একটি প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে, অলিম্পিক খেলোয়াড় হিসেবে নয়। তবু তাঁরা ম্যারাথনে নামলেন, তাও খালি পায়ে।

লেন তাউ ছিলেন দুর্দান্ত গতিতে, পদক জেতার সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু পথে একদল বুনো কুকুর তাঁকে তাড়া করল, ফলে প্রায় এক মাইল তিনি ভুল পথে দৌড়াতে বাধ্য হন। তবু তিনি নবম স্থানে শেষ করলেন। আজ ইতিহাসবিদরা মনে করেন, কুকুরের ঘটনা না ঘটলে তাউ পদক জিততেও পারতেন। তিনি ছিলেন অলিম্পিক ম্যারাথনে অংশ নেওয়া প্রথম আফ্রিকানদের একজন।

ফলাফল: ৩২ জনের মধ্যে শেষ করলেন মাত্র ১৪

শেষ পর্যন্ত ৩২ জন শুরু করে দৌড় শেষ করলেন মাত্র ১৪ জন। বাকিরা ধুলো, গরম, পানিশূন্যতা আর ক্লান্তিতে ঝরে পড়লেন। উইলিয়াম গার্সিয়া নামে একজন রাস্তার পাশে প্রায় মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিলেন, ধুলো খেয়ে তাঁর পাকস্থলীর ভেতরটা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এই ঘটনা থেকেই পরবর্তী অলিম্পিকে ম্যারাথনের নিয়ম বদলাতে শুরু করে। পানীয়ের ব্যবস্থা, চিকিৎসা সহায়তা আর কঠোর তদারকি ধীরে ধীরে মানদণ্ড হয়ে ওঠে। ডোপিং নিয়ে সচেতনতাও এসেছিল অনেক পরে, যখন বোঝা গেল স্ট্রিকনিনের মতো জিনিস কতটা বিপজ্জনক।

এই গল্প থেকে আমরা কী শিখি?

১. খেলার নিয়ম সময়ের সঙ্গে বদলায়। যা একসময় "স্বাভাবিক" ছিল, আজ তা অপরাধ।

২. ইতিহাসে ভুলে যাওয়া মানুষদের জায়গা দেওয়া জরুরি। লেন তাউ বা কারভাহালের মতো মানুষরা পদক পাননি, কিন্তু গল্পটা তাঁদেরই সবচেয়ে মনে রাখার মতো।

৩. প্রতারণা শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে, তবে লরজের মতো হাসিমুখে ক্ষমা চাইলে দ্বিতীয় সুযোগও মেলে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১৯০৪ অলিম্পিক ম্যারাথনে কে জিতেছিলেন?

আমেরিকান টমাস হিকস, সময় ৩ ঘণ্টা ২৮ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড।

ফ্রেড লরজ কেন অযোগ্য ঘোষিত হন?

তিনি দৌড়ের একটি অংশ গাড়িতে চড়ে পার হয়েছিলেন।

হিকসকে কী খাওয়ানো হয়েছিল?

স্ট্রিকনিন, ডিমের সাদা অংশ ও ব্র্যান্ডির মিশ্রণ। সে সময় এটি উদ্দীপক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

অলিম্পিক ম্যারাথনের দূরত্ব কত?

বর্তমানে ৪২.১৯৫ কিলোমিটার, যা ১৯২৪ সালে মানদণ্ড হিসেবে স্থির হয়।

ম্যারাথনের ইতিহাস শুরু হয়েছিল এক গ্রিক সৈনিকের গল্প দিয়ে, আর ১৯০৪ সালে এসে তা পরিণত হলো এক বিশাল প্রহসনে। তবু এই বিশৃঙ্খলা থেকেই আধুনিক অলিম্পিকের নিরাপত্তা, নিয়ম ও ন্যায্যতার ভিত্তি শক্ত হয়েছে। পরেরবার ম্যারাথন দেখার সময় ভাবুন, ১২০ বছর আগে কেউ হয়তো এই একই পথে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন!


Comments

Post a Comment